রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শনিবার মস্কোর রেড স্কয়ারে বার্ষিক বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নিয়ে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে পুতিন ইউক্রেনে চলমান সামরিক অভিযানকে একটি ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেন। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শত শত সামরিক কর্মকর্তার সামনে দেওয়া ভাষণে পুতিন দাবি করেন যে ইউক্রেন একটি আক্রমণাত্মক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যাদের সরাসরি অস্ত্র ও সমর্থন দিচ্ছে পুরো ন্যাটো জোট। এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন রাশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
এবারের বিজয় দিবসের আয়োজন ছিল বিগত বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন এবং সংকুচিত। রয়টার্সের তথ্যমতে, বছরের পর বছর ধরে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে রাশিয়ার যে বিশাল সাঁজোয়া যান বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রদর্শনী দেখা যেত, এবার তা লক্ষ্য করা যায়নি। পরিবর্তে রেড স্কয়ারের কুচকাওয়াজে হাজার হাজার পদাতিক সেনা মার্চ করেন। তবে রেড স্কয়ারের আকাশে রুশ যুদ্ধবিমানগুলো উড়ার সময় রাশিয়ার পতাকার তিনটি রঙের ধোঁয়া তৈরি করে এক বর্ণিল আবহ তৈরি করে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল নজিরবিহীন রকমের কড়াকড়ি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল বেশ নিয়ন্ত্রিত।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এই কুচকাওয়াজের ঠিক আগে রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি তিন দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে শুরুতেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিজয় দিবসের প্যারেড শেষ হওয়ার পরপরই রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে যে ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। যদিও এই অভিযোগের সপক্ষে ক্রেমলিন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেনি এবং কিয়েভও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে রয়টার্স জানিয়েছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখনো বেশ অস্পষ্ট।
পুতিন তার ভাষণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত সেনাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন যে বিজয়ী প্রজন্মের সেই বীরত্বই বর্তমানের বিশেষ সামরিক অভিযানে নিয়োজিত সেনাদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। তিনি রুশ নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী এবং সামরিক সাংবাদিকদের অবদানের প্রশংসা করেন। পুতিন জোর দিয়ে বলেন যে যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন হলেও দেশের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই থাকে। তার ভাষণের পরেই তোপধ্বনির মাধ্যমে বীরদের সম্মান জানানো হয় এবং সামরিক ব্যান্ড সংগীত পরিবেশন করা হয়।
আন্তর্জাতিক উপস্থিতির দিক থেকে এবারের কুচকাওয়াজ ছিল বেশ সীমিত। বিদেশি অতিথিদের মধ্যে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, মালয়েশিয়ার সুলতান ইব্রাহিম এবং উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শভকাত মিরজিওয়েভ উপস্থিত ছিলেন। ইইউ দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকোকে পুতিনের সাথে বৈঠক করতে দেখা গেছে। গত বছরের ৮০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে যেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সহ ২৭ জন বিশ্বনেতা উপস্থিত ছিলেন, সেই তুলনায় এবারের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তবে এবার রেড স্কয়ারে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের কুচকাওয়াজে অংশ নিতে দেখা গেছে যা একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মস্কোর বাইরে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের ভ্লাদিভোস্তক সহ অন্যান্য শহরেও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান পালিত হয়েছে। ভ্লাদিভোস্তকে কয়েক ঘণ্টা আগেই কুচকাওয়াজ এবং ইমর্টাল রেজিমেন্ট মার্চ শুরু হয়। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে রাশিয়ার বেশ কিছু শহরে বড় ধরনের কুচকাওয়াজ বাতিল করা হয়েছে এবং কিছু এলাকায় অনুষ্ঠানগুলো ভার্চুয়ালি আয়োজন করা হয়েছে। বিজয় দিবসের এই অনুষ্ঠানকে পুতিন দীর্ঘকাল ধরে রাশিয়ার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসলেও, এটি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারানো ২ কোটি ৭০ লাখ সোভিয়েত নাগরিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি জাতীয় মুহূর্ত।
