পারস্য উপসাগরে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৪ দফার শান্তি প্রস্তাবটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা একটি ন্যায়সংগত এবং ব্যাপক ভিত্তিক চুক্তির লক্ষ্যে এই প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে। আল জাজিরা ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী হোয়াইট হাউস গত শুক্রবারের মধ্যে ইরানের প্রতিক্রিয়া আশা করলেও তেহরান এখনো তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। মূলত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীই এখন এই আলোচনার প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। গত ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর দুই পক্ষ আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে। ওয়াশিংটন যে প্রস্তাবটি সামনে এনেছে তাতে ইরানকে অন্তত ১২ বছরের জন্য তাদের পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। একই সাথে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিনিময়ে কয়েক দশকের পুরনো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী তেহরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত আছে যা তারা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান এই মজুত হস্তান্তর করুক এবং ১২ বছর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বা ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণ থেকে দূরে রাখা। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে যে কোনো চুক্তি হতে হবে সম্মানজনক এবং তাতে ইরানের জাতীয় স্বার্থের পূর্ণ নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রোমে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে তারা পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইরানের উত্তর পাওয়ার আশা করছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে তেহরানের প্রতিক্রিয়া আলোচনার একটি গঠনমূলক প্রক্রিয়ার পথ প্রশস্ত করবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও গত কয়েক দিনে একাধিকবার দাবি করেছেন যে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানো খুব দ্রুতই সম্ভব হবে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনো কিছুটা ভিন্ন।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থা এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের অবরোধ এবং মার্কিন নৌবাহিনীর পাল্টা অবস্থানের ফলে এই এলাকায় মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তেহরান মনে করছে যে ওয়াশিংটনের নৌ-অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ মহলের ধারণা অনুযায়ী তারা এমন কোনো চুক্তিতে সই করতে চায় না যা ভবিষ্যতে তাদের কৌশলগত শক্তিকে দুর্বল করে দেবে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তেহরানের এই সময় নেওয়াকে কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন ইরান প্রতিটি দফার খুঁটিনাটি যাচাই করছে যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করতে না পারে। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট নিরসনে এই চুক্তির কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয় হলো তেহরান মার্কিন এই ১৪ দফার প্রস্তাবটি হুবহু মেনে নেয় নাকি নতুন কোনো সংশোধনী পেশ করে।
