রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩

জ্যামাইকার হারানো জলজ স্বর্গ: ৬০ দশকের ছবি থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১০, ২০২৬, ১০:১৫ পিএম

জ্যামাইকার হারানো জলজ স্বর্গ: ৬০ দশকের ছবি থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা

জ্যামাইকার উত্তর উপকূলের স্বচ্ছ নীল জলের নিচে এক সময় লুকিয়ে ছিল এক জাদুকরী জগত। ১৯৬০-এর দশকে সামুদ্রিক বিজ্ঞানী আইলিন গ্রাহামের তোলা এক হাজারেরও বেশি দুর্লভ আলোকচিত্র এখন সেই হারানো স্বর্গের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ছবিগুলো কেবল অতীতের নস্টালজিয়া নয়, বরং বিজ্ঞানীদের কাছে এখন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। যা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে কয়েক দশক আগেও সমুদ্রের এই প্রবাল প্রাচীরগুলো কতটা প্রাণবন্ত এবং বৈচিত্র্যময় ছিল। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বিপর্যস্ত জ্যামাইকার প্রবাল প্রাচীরগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে এই ছবিগুলোই এখন পথ দেখাচ্ছে।

১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যে আইলিন গ্রাহাম যখন ডিসকভারি বে, রানওয়ে বে এবং রিও বুয়েনোর গভীরে ডুব দিয়েছিলেন, তখন ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ ছিল না। তবুও তার লেন্সে ধরা পড়েছিল এমন এক ইকোসিস্টেম যা আজ কল্পনার অতীত। সেই সময় সমুদ্রের তলদেশের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ জুড়েই ছিল জীবন্ত প্রবাল। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞানী জেলানি উইলিয়ামস এই ছবিগুলোকে সমুদ্রের বৃষ্টি অরণ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। ছবিগুলোতে দেখা যায় বড় বড় স্ন্যাপার এবং গ্রুপার মাছের ঝাঁক প্রবালের আড়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা একটি সুস্থ সামুদ্রিক পরিবেশের লক্ষণ।

তবে সময়ের বিবর্তনে এই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। ১৯৮০ সালের ঘূর্ণিঝড় অ্যালেন থেকে শুরু করে গত বছরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় মেলিসা পর্যন্ত একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয় জ্যামাইকার সমুদ্রতলের এই সম্পদকে ধ্বংস করেছে। বর্তমানে প্রবালের আচ্ছাদন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশে। লন্ডনের প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের গবেষক কেন জনসন যখন ২০১৯ সালে এই আর্কাইভটি খুঁজে পান, তখন তিনি বর্তমান পরিস্থিতির সাথে এর পার্থক্য দেখে হতবাক হয়ে যান। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে মানুষ এখন এই ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিচ্ছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় শিফটিং বেসলাইন সিনড্রোম। আইলিন গ্রাহামের ছবিগুলো এই ভুল ধারণা ভাঙতে সাহায্য করবে এবং আসল সুস্থ পরিবেশ কেমন ছিল তার একটি মানদণ্ড তৈরি করে দেবে।

প্রবাল প্রাচীরের এই অবক্ষয় কেবল সমুদ্রের তলদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়ছে জ্যামাইকার স্থলভাগ এবং অর্থনীতিতেও। ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী কামিলো ট্রেঞ্চ জানিয়েছেন যে জ্যামাইকার বিখ্যাত সাদা বালুর সমুদ্র সৈকত আসলে কয়েক দশক আগের প্রবাল প্রাচীরেরই অবদান। সুস্থ প্রবাল প্রাচীর সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝাপটা থেকে উপকূলকে রক্ষা করে। প্রবাল ধ্বংস হওয়ার ফলে এখন সমুদ্র সৈকতে ভাঙন দেখা দিচ্ছে, যা পর্যটন শিল্পের জন্য বড় হুমকি। এছাড়া ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে সামুদ্রিক আর্চিন বা কণ্টকাকীর্ণ প্রাণীর ব্যাপক মৃত্যু প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। কারণ এই প্রাণীগুলো শৈবাল খেয়ে প্রবালকে বাড়তে সাহায্য করত।

বর্তমানে জ্যামাইকার সমুদ্র উপকূল পর্যটকদের চাপে পিষ্ট। অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলে প্রবাল প্রাচীর পরিষ্কার রাখার মতো মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবালগুলো সাদা হয়ে মারা যাচ্ছে। জেলানি উইলিয়ামসের মতে গত বছরের ক্যাটাগরি ৫ ঘূর্ণিঝড় মেলিসা জ্যামাইকার মানুষের মনে যে ক্ষত তৈরি করেছে, তার চেয়েও গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে সমুদ্রের নিচে। ১৮৫ মাইল বেগে বয়ে যাওয়া বাতাস আর জলোচ্ছ্বাস প্রবালের হাড়গোড় পর্যন্ত চুরমার করে দিয়েছে।

তবে আইলিন গ্রাহামের এই আলোকচিত্রগুলো নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের আশা জোগাচ্ছে। তারা এখন জানেন যে তাদের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত। একটি ধ্বংসস্তূপকে কেবল রক্ষা করা নয়, বরং তাকে ১৯৬০-এর দশকের সেই আদি ও উজ্জ্বল অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়াই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। এই ছবিগুলো যদি না থাকত তবে হয়তো বর্তমান প্রজন্ম জানতেই পারত না যে তাদের সমুদ্রের তলদেশে এক সময় প্রবালের এক বিশাল সাম্রাজ্য ছিল। জ্যামাইকার এই হারানো স্বর্গ পুনরুদ্ধার করা এখন কেবল পরিবেশের বিষয় নয়, এটি দ্বীপরাষ্ট্রটির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

banner
Link copied!