হজের তিনটি প্রধান ফরজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। ইসলামের দৃষ্টিতে এই অবস্থান বা উকুফে আরাফা ছাড়া হজ পূর্ণ হয় না। রাসুলুল্লাহ (স.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে আরাফাই হলো হজ। মক্কা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই বিশাল মরু প্রান্তরটি কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থান নয় বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের এক অনন্য প্রতীক। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.) দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এই ময়দানেই পরস্পরকে চিনেছিলেন বলে এর নাম হয়েছে আরাফাত। ২০২৬ সালের হজের প্রস্তুতি গ্রহণকারী হাজিদের জন্য এই ময়দানের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান।
আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের নির্দিষ্ট সময় শুরু হয় ৯ জিলহজ সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার পর অর্থাৎ জোহরের ওয়াক্ত থেকে এবং এটি সূর্যাস্ত পর্যন্ত বজায় রাখা ওয়াজিব। হাজিদের জন্য সুন্নত হলো এদিন ফজরের পর মিনা থেকে তালবিয়া পাঠ করতে করতে আরাফাতের দিকে রওনা হওয়া। তবে সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি হলো আরাফাতের নির্ধারিত সীমানার ভেতরে অবস্থান নিশ্চিত করা। অনেক হাজি ভুলবশত জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়কে একমাত্র গন্তব্য মনে করেন কিন্তু পুরো সমতল ময়দানটিই আরাফার অন্তর্ভুক্ত। এখানে একটি সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে উরানা উপত্যকা আরাফার সীমানার বাইরে অবস্থিত। পিলারের মাধ্যমে চিহ্নিত এই সীমানার বাইরে অবস্থান করলে হাজিদের ফরজ রুকন আদায় হবে না এবং হজ বাতিল হয়ে যাবে।
এদিনের ইবাদতের একটি বিশেষ দিক হলো জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে কসর করে আদায় করা। মসজিদে নামিরায় ইমামের খুতবা শোনা ও নামাজ পড়া উত্তম হলেও তাবু বা নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করে একাকী বা জামাতে নামাজ পড়লেও ফরজ আদায় হয়ে যায়। দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টি হাজিদের জন্য দোয়ার সর্বোত্তম সময়। রাসুলুল্লাহ (স.) এই সময়ে কেবলামুখী হয়ে দুই হাত তুলে রোনাজারি করতেন। আরাফার ময়দানে পঠিত দোয়াগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো তাওহিদের ঘোষণা সম্বলিত সেই দোয়া যা রাসুলুল্লাহ (স.) ও পূর্ববর্তী নবীগণ পাঠ করেছেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু দোয়াটি হাজিদের মুখে বারবার উচ্চারিত হওয়া উচিত।
আরাফা দিবসের আরেকটি বড় ফজিলত হলো এটি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার দিন। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা এই দিনে হাজিদের নিয়ে আসমানবাসীদের কাছে গর্ব করেন এবং অগণিত মানুষকে ক্ষমা করে দেন। হাজিদের জন্য এই দিনে রোজা রাখা মাকরুহ কারণ দোয়া ও ইবাদতে পূর্ণ শক্তি বজায় রাখা জরুরি। সূর্যাস্তের আগে কোনোভাবেই আরাফার ময়দান ত্যাগ করা যাবে না। সূর্যাস্তের পর হাজিরা মাগরিবের নামাজ না পড়েই মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। মাগরিব ও এশা উভয় ওয়াক্তের নামাজ মুজদালিফায় গিয়ে একত্রে আদায় করাই হজের সুনিশ্চিত সুন্নত। এই মহা সমাবেশ আমাদের কিয়ামতের হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যেখানে সকল মানুষ একই পোশাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে।
