সাবেক উপদেষ্টা ও খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৬ বছরের শাসনকাল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বয়ান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি অভিযোগ করেছেন যে বর্তমানে এক শ্রেণির মানুষের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে গত দেড় দশকে দেশে কোনো অপরাধই সংঘটিত হয়নি। রোববার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এই মন্তব্য করেন। ফারুকী মনে করেন গত ১৬ বছরের কর্মকাণ্ডকে আড়াল করে বর্তমান পরিস্থিতিতে যারা ‘আপা’ অর্থাৎ শেখ হাসিনার প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন, তারা আসলে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকেই অপরাধ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করছেন।
নিজের পোস্টে ফারুকী ফ্যাসিবাদের উত্থান নিয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণও হাজির করেছেন। তিনি লিখেছেন যে ‘কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচার’ বা সম্মতি উৎপাদন করার বুদ্ধিবৃত্তিক কারখানা ছাড়া ফ্যাসিজম কখনও জন্ম নিতে এবং বিস্তার লাভ করতে পারে না। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশে এই নির্দিষ্ট অপরাধটিকে অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক লেভেলে ফ্যাসিবাদের সহযোদ্ধা হওয়ার বিষয়টিকে কখনও সঠিকভাবে অ্যাড্রেস বা চিহ্নিত করা হয়নি। এই অপরাধকে অমীমাংসিত রেখে সামাজিক পুনর্মিলন বা তথাকথিত ‘নরমালাইজেশন’ করার চেষ্টা করাকে তিনি অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করেন। এই অবস্থাকে তিনি অজগর সাপকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকার সাথে তুলনা করেছেন।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার পোস্টে বর্তমান সময়কে ‘পোস্ট-আপরাইজিং’ বা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে এই সময়টি কোনো স্বাভাবিক সময় নয়। তিনি মনে করেন যে দেশে প্রকৃত সামাজিক রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন প্রয়োজন, কিন্তু তার একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। ফারুকীর মতে এই পুনর্মিলন বা ক্ষমার প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়া উচিত অপরাধ স্বীকার করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বর্তমানে চারপাশে যারা হঠাৎ ‘জেগে উঠেছেন’, তাদের মৃদু আলাপ বা প্রচারণার ধরনে ফারুকী ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন এদের কথা শুনলে মনে হয় যেন ১৬ বছরে কোনো অপরাধই হয়নি বরং গণঅভ্যুত্থানটিই ছিল একটি মস্ত বড় ভুল বা অপরাধ।
ফেসবুক পোস্টে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে দুটি প্রধান ‘রেড লাইন’ বা সীমানার কথা উল্লেখ করেছেন। ফারুকীর মতে ১৯৭১ সাল বাংলাদেশের প্রথম বড় রেড লাইন এবং ২০২৪ সাল হলো দ্বিতীয় রেড লাইন। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে বড় বড় জাতীয় ঘটনাগুলো কিছু সীমানা টেনে দেয় যা অতিক্রম করা বিপজ্জনক হতে পারে। ফারুকী লিখেছেন যে ৭১ বাদ দিলে বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৪-এর মতো এত বড় ঘটনা আর কখনও ঘটেনি। ফলে এই রেড লাইন ক্রস করার বা গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে তুচ্ছজ্ঞান করার আগে সবার গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বিগত সরকারের সময় শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী মহলের একটি অংশের নীরবতা কিংবা সরাসরি সমর্থনের বিষয়টিকে ফারুকী শুরু থেকেই সমালোচনা করে আসছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে তিনি এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে আরও বেশি সোচ্চার। তার এই স্ট্যাটাসটি ইতিমধ্যে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন ফারুকী মূলত সেই সব সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক কর্মীদের ইঙ্গিত করেছেন যারা শেখ হাসিনার শাসনামলের অন্যায়গুলোকে পাশ কাটিয়ে বর্তমান অস্থিরতাকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। ফারুকীর এই বক্তব্য জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের চেতনাকে রক্ষা করার এক শক্তিশালী আহ্বান হিসেবে দেখছেন তার অনুসারীরা।
