সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩

গুহায় আটকে পড়া তিন বন্ধুর মুক্তি: নেক আমলের অলৌকিক শক্তি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১০, ২০২৬, ১১:৫০ পিএম

গুহায় আটকে পড়া তিন বন্ধুর মুক্তি: নেক আমলের অলৌকিক শক্তি

মানুষের জীবন সব সময় একই সমান্তরালে চলে না। কখনো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি আসে যখন চারপাশের সব পার্থিব পথ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৬ সালের এই আধুনিক যুগেও মানুষ যখন নানা মানসিক ও সামাজিক সংকটে পিষ্ট, তখন দেড় হাজার বছর আগের একটি হাদিস আমাদের নতুন করে আশার আলো দেখায়। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত গুহায় আটকে পড়া তিন বন্ধুর সেই অলৌকিক ঘটনাটি কেবল একটি ঐতিহাসিক গল্প নয় বরং এটি ইবাদতের একনিষ্ঠতা ও নেক আমলের শক্তির এক জীবন্ত দলিল। রাসুলুল্লাহ (স.) বর্ণিত এই কাহিনী আমাদের শেখায় যে লোকচক্ষুর আড়ালে করা কোনো সৎ কাজ কীভাবে জীবনের চরম সংকটে আল্লাহর বিশেষ সাহায্যের অসিলা হতে পারে। সেই প্রাচীন সময়ে তিন ব্যক্তি সফরে থাকাকালীন বৃষ্টির কবলে পড়ে একটি পাহাড়ি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন কিন্তু হঠাৎ একটি বিশাল পাথর ধসে পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তাদের জীবনে করা সবচেয়ে খাঁটি আমলগুলোর অসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন।

প্রথম ব্যক্তিটি তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি অগাধ ভক্তি ও সেবার কথা উল্লেখ করলেন। তিনি পেশায় পশুপালক ছিলেন এবং প্রতিদিন নিয়ম করে নিজের সন্তানদের আগে তার বাবা-মাকে দুধ পান করাতেন। একদিন কাজ থেকে ফিরতে দেরি হওয়ায় তিনি দেখেন তার বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাদের ঘুম না ভাঙিয়ে সারা রাত দুধের পাত্র হাতে শিয়রে দাঁড়িয়ে রইলেন অথচ তার ক্ষুধার্ত সন্তানরা পায়ের কাছে কান্নাকাটি করছিল। তিনি দোয়া করলেন যে যদি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এই আমলটি করে থাকেন তবে যেন পাথরটি সরিয়ে দেওয়া হয়। অমনি পাথরটি কিছুটা সরে গেল কিন্তু বাইরে বের হওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল না। এই ঘটনাটি আমাদের সমাজে বাবা-মায়ের হক আদায়ের গুরুত্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয় যা বর্তমান যুগে অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত হচ্ছে।

দ্বিতীয় ব্যক্তিটি তার জীবনের এক কঠিন চারিত্রিক পরীক্ষার কথা তুলে ধরলেন। তিনি তার এক আত্মীয় কন্যাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং অভাবের সুযোগ নিয়ে তাকে গুনাহের দিকে প্রলুব্ধ করেছিলেন। কিন্তু যখনই তিনি চূড়ান্ত অবাধ্যতায় লিপ্ত হতে যাচ্ছিলেন তখনই মেয়েটি তাকে আল্লাহর ভয় স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই মুহূর্তে তিনি কেবল আল্লাহর ভয়ে সেই স্থান ত্যাগ করেন এবং মেয়েটিকে আর্থিক সাহায্যও করেন। তিনি যখন এই গোপন ত্যাগের অসিলা দিয়ে দোয়া করলেন তখন পাথরটি আরও খানিকটা সরে গেল। এটি প্রমাণ করে যে প্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহের যুগেও যখন মানুষ নির্জনে গুনাহের সুযোগ পায় তখন কেবল আল্লাহর ভয়ই হতে পারে শ্রেষ্ঠ ঢাল। কুপ্রবৃত্তি দমন করে সতীত্ব রক্ষা করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি নেক আমল।

তৃতীয় ব্যক্তিটি তার সততা ও আমানত রক্ষার এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত পেশ করলেন। তার অধীনে কর্মরত এক শ্রমিক তার পারিশ্রমিক না নিয়েই চলে গিয়েছিল। তিনি সেই টাকাটি ফেলে না রেখে তা দিয়ে পশুপালন শুরু করেন যা কয়েক বছরে এক বিশাল খামারে পরিণত হয়। দীর্ঘ সময় পর সেই শ্রমিক ফিরে এসে তার পাওনা চাইলে তিনি পুরো খামারের সব সম্পদ তাকে বুঝিয়ে দেন। কোনো প্রকার স্বার্থ ছাড়াই তিনি অন্যের সম্পদকে কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি যখন এই আমানত রক্ষার অসিলা দিয়ে দোয়া করলেন অমনি বিশাল সেই পাথরটি পুরোপুরি সরে গেল। এই ঘটনাটি আমাদের বর্তমান ব্যবসায়িক ও পেশাদার জীবনে সততার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়। তিন বন্ধু মুক্ত হয়ে আলোর পৃথিবীতে ফিরে এলেন যা আমাদের শেখায় যে অন্তরের বিশুদ্ধতা ও গোপন ইবাদতই মানুষের প্রকৃত সম্পদ।

banner
Link copied!