স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে অনেক শিরোপা লড়াই নাটকীয়তা আর শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চে ঠাসা থাকলেও এবারের লা লিগা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্পের। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর এবার ফুটবল বিশ্ব দেখল হানসি ফ্লিকের নতুন বার্সেলোনার অপ্রতিরোধ্য যাত্রা। গত রবিবার ঘরের মাঠে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে ২-০ গোলে হারিয়ে ১৪ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে লা লিগার শিরোপা নিশ্চিত করেছে কাতালানরা। প্রায় ১০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম এল ক্লাসিকোর ফলাফল সরাসরি লিগ শিরোপার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিল। ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই মৌসুমেই বার্সাকে লিগ জেতালেন জার্মান কোচ হানসি ফ্লিক।
বার্সেলোনার এই সাফল্যের নেপথ্যে ছিল তাদের অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ফ্লিকের শিষ্যরা হারের মুখ দেখেনি এবং সবশেষ টানা ১১টি ম্যাচে জয় তুলে নিয়েছে তারা। পুরো মৌসুমে লিগে তারা মাত্র চারটি ম্যাচে পরাজিত হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, লা লিগায় ঘরের মাঠে এবার বার্সেলোনার জয়ের হার ছিল শতভাগ। যদিও তারা কোপা দেল রে এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে ছিটকে পড়ে কিছুটা হতাশ হয়েছিল, কিন্তু লিগের লড়াইয়ে তাদের আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বার্সার জয়ের হার ৭৯ শতাংশ, যা ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে বায়ার্ন মিউনিখের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
২০২৪ সালের মে মাসে যখন হানসি ফ্লিক বার্সেলোনার দায়িত্ব নেন, তখন রিয়াল মাদ্রিদ ছিল লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী এক শক্তিশালী দল। দলে যোগ দিয়েছিলেন কিলিয়ান এমবাপের মতো তারকা। কিন্তু মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ফ্লিক বার্সেলোনাকে আমূল বদলে দিয়েছেন। জার্মান কোচের অধীনে সম্ভব ছয়টি ঘরোয়া ট্রফির মধ্যে পাঁচটিই জিতেছে বার্সা। অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদকে টানা দ্বিতীয় মৌসুম কাটাতে হচ্ছে কোনো শিরোপা ছাড়াই। ফ্লিকের এই পরিবর্তনের মূলে ছিল খেলোয়াড়দের ওপর তার কড়া শৃঙ্খলা এবং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ। তিনি বার্সার ঐতিহ্যবাহী ফুটবল দর্শনের সাথে আধুনিক গতির মিশ্রণ ঘটিয়েছেন।
বার্সার এই জয়যাত্রার উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল। ১৮ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের ওপর অগাধ আস্থা রেখেছিলেন ফ্লিক। তার ড্রিবলিং আর সৃজনশীলতা বার্সার ডান প্রান্তকে স্পেনের সবচেয়ে বিপজ্জনক আক্রমণভাগে পরিণত করেছে। ইনজুরি সত্ত্বেও ইয়ামাল এই মৌসুমে ৪৫ ম্যাচে ২৪টি গোল করেছেন। ইয়ামালের পাশাপাশি পাউ কুবারসি এবং ফেরমিন লোপেজদের মতো লা মাসিয়া একাডেমি থেকে উঠে আসা তরুণদের মূল দলে নিয়মিত সুযোগ দিয়ে ফ্লিক এক নতুন প্রজন্মের ভিত্তি গড়ে তুলেছেন।
মৌসুমের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে ধারে আসা মার্কাস রাশফোর্ড। যদিও তিনি নিয়মিত একাদশে ছিলেন না, তবে বদলি হিসেবে নেমে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই প্রভাব ফেলেছেন তিনি। এল ক্লাসিকোর মতো বড় ম্যাচে ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত গোল করে বার্সার শিরোপা নিশ্চিত করেছেন এই ২৮ বছর বয়সী ফুটবলার। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে বার্সা কর্তৃপক্ষ তাকে ৩৫ মিলিয়ন ইউরোতে পাকাপাকিভাবে দলে নেওয়ার কথা ভাবছে। এছাড়া রবার্ট লেভানদোভস্কি তার ৩৭ বছর বয়সেও ফ্লিকের অধীনে পুরনো ধার ফিরে পেয়েছেন। পেদ্রি এবং রাফিনহারাও মাঝমাঠ ও আক্রমণে ছিলেন দুর্দান্ত কার্যকর।
অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের জন্য এই মৌসুম ছিল এক চরম বিপর্যয়ের নাম। জাভি আলোনসোর অধীনে দারুণ শুরুর পর নভেম্বরে এলচে ও রায়ো ভায়োকানোর সাথে ড্র করে পয়েন্ট হারায় তারা। জানুয়ারি মাসে স্প্যানিশ সুপার কাপে বার্সার কাছে হারের পর আলোনসো পদত্যাগ করেন। তার উত্তরসূরি আলভারো আরবেলোয়ার অধীনেও রিয়ালের ভাগ্য ফেরেনি। উল্টো ড্রেসিংরুমের কোন্দল আর খেলোয়াড়দের মধ্যকার বিবাদ রিয়ালকে সংকটে ফেলে দেয়। শিরোপার রেসে ১৪ পয়েন্ট পিছিয়ে পড়া রিয়ালের এই পতন স্প্যানিশ ফুটবলে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফ্লিকের হাত ধরে বার্সেলোনা এখন ইউরোপের ফুটবলে আবার তাদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের পথে।
