যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপর্যয়কর ফলাফলের পর চতুর্মুখী চাপের মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। নিজ দলের অভ্যন্তরে এবং বিরোধী শিবির থেকে ওঠা পদত্যাগের জোরালো দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। সোমবার লন্ডনে দেওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে স্টারমার ঘোষণা করেছেন যে তিনি ‘পালিয়ে যাবেন না’ বরং তার সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করবেন। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশটিকে নতুন কোনো রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দিতে তিনি রাজি নন। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি ইংল্যান্ডে প্রায় এক হাজার কাউন্সিল আসন হারিয়েছে এবং ২৭ বছর পর ওয়েলসের শাসন ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়েছে।
নির্বাচনী এই ভরাডুবির পর স্টারমার তার প্রধানমন্ত্রিত্ব বাঁচাতে একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সংকটাপন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘ব্রিটিশ স্টিল’ জাতীয়করণের ঘোষণা। তিনি জানিয়েছেন এই সপ্তাহেই প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হবে প্রতিষ্ঠানটি। স্কানথর্পের ইস্পাত কর্মীদের কর্মসংস্থান রক্ষা এবং দেশের কৌশলগত সক্ষমতা বজায় রাখতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা বেসরকারি মালিকানাধীন অস্থিরতা থেকে ইস্পাত শিল্পকে রক্ষা করতে একটি ‘সক্রিয় রাষ্ট্র’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চান বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন কিয়ার স্টারমার। ব্রেক্সিটের এক দশক পর তিনি ব্রিটেনকে আবার ‘ইউরোপের হৃদয়ে’ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন যে আগের সরকারগুলো ইউরোপের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে দেশকে দুর্বল করেছে তবে তার সরকার সম্পর্ক পুনঃনির্মাণের মাধ্যমে ব্রিটেনকে আবার শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে একটি নতুন প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক চুক্তি এবং তরুণদের জন্য ইউরোপে কাজ ও পড়াশোনার সুযোগ বা ‘ইউথ মোবিলিটি স্কিম’ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। আগামী জুনে অনুষ্ঠিতব্য ইইউ সম্মেলনে ব্রিটেনের এই নতুন যাত্রার প্রতিফলন ঘটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তবে ডাউনিং স্ট্রিটের অন্দরমহল থেকে আসা খবর অনুযায়ী স্টারমারের অবস্থান এখন বেশ নড়বড়ে। লেবার পার্টির অন্তত ৩০ জন সংসদ সদস্য ইতিমধ্যে তার পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন অথবা ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করতে চাপ দিচ্ছেন। উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার সরাসরি পদত্যাগের কথা না বললেও সরকারের ভেতরে ‘পছন্দের লোক পোষণ বা স্বজনপ্রীতির বিষাক্ত সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ‘রিফর্ম ইউকে’ পার্টির অভাবনীয় উত্থান লেবার পার্টির কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করেছে। স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে প্রায় ১,৩০০ আসনে জয়লাভ করে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই সংকটের মধ্যেও স্টারমার দাবি করেছেন যে তার সরকার কিছু বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সঠিক পথে ছিল। বিশেষ করে ইরানের সাথে যুদ্ধে না জড়ানো এবং জনসেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো তিনি সামনে এনেছেন। তবে মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ তার জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। সমালোচকদের মতে স্টারমারের এই নতুন নীতিগুলো মূলত তার গদি বাঁচানোর এক মরিয়া চেষ্টা। তবে সোমবারের ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। বুধবার রাজা চার্লসের ভাষণে সরকারের আগামী দিনের আইনি ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা আরও বিস্তারিতভাবে উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
