সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

মাতৃত্বের মহিমা ও ইসলাম: সন্তানের ওপর মায়ের অধিকার

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১১, ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম

মাতৃত্বের মহিমা ও ইসলাম: সন্তানের ওপর মায়ের অধিকার

পৃথিবীর বুকে নিঃশর্ত ত্যাগ ও অকৃত্রিম ভালোবাসার একমাত্র ঠিকানার নাম হলো মা। ইসলাম ধর্ম মাতৃত্বের এই সুমহান মর্যাদাকে সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে স্থান দিয়েছে। গত ১০ মে ২০২৬ তারিখে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে মা দিবস, যার এবারের প্রতিপাদ্য ছিল মাতৃত্ব: ভালোবাসা ও যত্নে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। যদিও আধুনিক বিশ্বে একটি বিশেষ দিনে মায়েদের স্মরণ করার রীতি প্রচলিত হয়েছে, কিন্তু ইসলামের সুমহান শিক্ষায় প্রতিটি দিনই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও সদাচরণের জন্য নির্ধারিত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম মানবী হাওয়া (আ.) থেকে শুরু করে আম্বিয়ায়ে কেরামের মাতা এবং উম্মাহাতুল মুমিনিনগণ মাতৃত্বের মর্যাদাকে যে গৌরবের আসনে বসিয়েছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।

মায়ের এই মর্যাদা কেবল সামাজিক বা লৌকিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি সরাসরি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন স্থানে মায়ের কষ্টের বর্ণনা দিয়ে সন্তানের ওপর তাঁর অধিকার নিশ্চিত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে যে মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছেন ও অতিকষ্টে প্রসব করেছেন এবং লালন-পালন করেছেন (সূরা আল-আহকাফ, ৪৬:১৫)। অন্য এক স্থানে আল্লাহ তাআলা জননীর এই ত্যাগকে আরও আবেগপূর্ণ ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে জননী সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেন এবং তাঁর দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে (সূরা লুকমান, ৩১:১৪)। এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে একজন মা সন্তানের জন্য যে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট সহ্য করেন, তার প্রতিদান দেওয়ার ক্ষমতা কোনো মানুষের নেই।

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদিসেও মায়ের অধিকারকে বাবার চেয়ে তিন গুণ বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একবার এক সাহাবি আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন যে তাঁর ওপর কার অধিকার সবচেয়ে বেশি। উত্তরে নবীজি (সা.) তিনবার মায়ের কথা উচ্চারণ করেন এবং চতুর্থবার বাবার কথা বলেন (সহীহ আল-বুখারী, ৫৯৭১)। এই হাদিসটি ইসলামের পারিবারিক কাঠামোতে মায়ের সুউচ্চ অবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এমনকি বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.) বা বায়োজিদ বোস্তামি (রহ.)-এর মতো মহান অলি-বুজুর্গগণ যে আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, তার মূলে ছিল তাঁদের মায়ের দোয়া ও সেবা। মায়ের সন্তুষ্টির মাধ্যমেই যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব, তা ইসলামের প্রতিটি স্তরে প্রমাণিত।

মজার বিষয় হলো পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ভাষাতেই মা ডাকের উচ্চারণে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। ভাষাবিদদের মতে শিশুরা যখন প্রথম কথা বলা শেখে, তখন দুধ পানের সময় তাদের মুখ থেকে যে স্বাভাবিক ধ্বনি বের হয়, তা অনেকটা ম অক্ষরের মতো শোনায়। ইংরেজি মাদার, জার্মান মাট্টার, হিন্দি বা বাংলা ভাষায় মা—সবই যেন এক সুতোয় গাঁথা। মা শব্দটির সাথে মিশে আছে গভীর আবেগ ও আত্মার সম্পর্ক। পল্লী কবি জসীমউদ্দীন তাঁর পল্লী জননী কবিতায় মায়ের সেই চিরন্তন মমতা ও ত্যাগের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন, যেখানে অসুস্থ সন্তানের শিয়রে বসে থাকা এক মা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সন্তানের আয়ু গণনা করেন।

বর্তমানে কর্পোরেট সংস্কৃতির আড়ালে মা দিবসের আনুষ্ঠানিকতা বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে মায়েরা বার্ধক্যে বড়ই একা ও অবহেলিত হয়ে পড়েন। অথচ ইসলাম শিখিয়েছে মায়ের সেবা জান্নাত লাভের সহজ মাধ্যম। সন্তানের জন্য মায়ের ত্যাগ এতটাই বিশাল যে অনেক ক্ষেত্রে মমতাজ মহলের মতো মায়েরা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে নিজের প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করেন। তাজমহলের পাথরের আড়ালে যে ইতিহাস ঢাকা পড়ে আছে, তা মূলত একজন মায়ের আত্মত্যাগেরই গল্প। তাই মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বা বছরের অন্য যেকোনো দিনই হোক না কেন, মায়ের প্রতি ভালোবাসা যেন কেবল উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। অন্তরে মায়ের জন্য স্থায়ী শ্রদ্ধা এবং কাজের মাধ্যমে তাঁর সেবা নিশ্চিত করাই হোক আধুনিক প্রজন্মের শপথ।

banner
Link copied!