যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উত্তরের শহর উটকিয়াগভিকে বর্তমানে এক বিরল এবং বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনা শুরু হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই শহরে আগামী টানা ৮৪ দিন সূর্য অস্ত যাবে না। আর্কটিক অঞ্চলের এই শহরটি এখন ‘মিডনাইট সান’ বা মধ্যরাতের সূর্যের সময়কালে প্রবেশ করেছে, যার ফলে দিন এবং রাত—পুরো সময়জুড়েই আকাশ আলোকিত থাকবে। পৃথিবীর অক্ষের বিশেষ অবস্থান এবং সূর্যের চারদিকে এর ঘূর্ণন পদ্ধতির কারণেই মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি থাকা এলাকাগুলোতে এমন অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিজ্ঞানীদের কাছে এই ঘটনাটি এক অনন্য অভিজ্ঞতার নাম।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, উটকিয়াগভিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সূর্য অস্ত যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। গত শনিবার এই মৌসুমের শেষ সূর্যাস্ত দেখেছিলেন শহরটির বাসিন্দারা। এরপর থেকে সূর্য দিগন্তের নিচে না নেমে পুরো সময় আকাশেই অবস্থান করছে। শনিবার স্থানীয় সময় রাত ২টা ৫৭ মিনিটে সূর্য উদিত হওয়ার পর থেকে এই যাত্রা শুরু হয়েছে এবং আগামী ২ আগস্ট পর্যন্ত সেখানে আর কোনো সূর্যাস্ত দেখা যাবে না। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস স্থায়ী এই পরিস্থিতিকে ভৌগোলিক পরিভাষায় ‘মিডনাইট সান’ বলা হয়। উটকিয়াগভিক আর্কটিক সার্কেল থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে আলোর এই চরম চক্র অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
এই ঘটনার পেছনে থাকা বৈজ্ঞানিক কারণটি বেশ চমকপ্রদ। পৃথিবী তার কক্ষপথের তুলনায় প্রায় ২৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকে। সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরার সময় এই হেলে থাকা অবস্থানের কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বছরের বিভিন্ন সময়ে সূর্যালোকের তারতম্য ঘটে। উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে যখন উত্তর মেরু সূর্যের দিকে বেশি হেলে থাকে, তখন আর্কটিক সার্কেলের ওপরের অঞ্চলগুলোতে সূর্য দিগন্তের নিচে নামতে পারে না। ফলে সূর্য আকাশে নিচু কোণে সারাক্ষণ ঘুরতে থাকে এবং মধ্যরাতেও দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল পরিবেশ বজায় থাকে।
তবে এই উজ্জ্বল দিনগুলোর বিপরীতে শীতকালে শহরটিতে ঘটে ঠিক উল্টো ঘটনা। তখন প্রায় ৬০ দিনেরও বেশি সময় শহরটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে থাকে এবং সূর্যের দেখা মেলে না। এই সময়টিকে বলা হয় ‘পোলার নাইট’ বা মেরু রাত। ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে গবেষকরা জানান যে, কোনো স্থান মেরুর যত বেশি কাছে হবে, সেখানকার মৌসুমি আলোর পরিবর্তন তত বেশি নাটকীয় হয়ে ওঠে। এমনকি উত্তর মেরুর মূল কেন্দ্রবিন্দুতে বছরে মাত্র একবার সূর্য ওঠে এবং একবার অস্ত যায়, যার ফলে সেখানে ছয় মাস দিন এবং ছয় মাস রাত থাকে।
বিজ্ঞানীদের জন্য উটকিয়াগভিকের এই দীর্ঘায়িত দিনের আলো গবেষণার এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দেয়। পৃথিবীর কক্ষপথ, বায়ুমণ্ডলের আচরণ এবং চরম প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের শারীরিক ও মানসিক মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে এখানে নিয়মিত গবেষণা চলে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় সূর্যের আলোর উপস্থিতি মানুষের ঘুমের চক্র বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’-এ কী ধরনের পরিবর্তন আনে, তা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বিশেষ আগ্রহী। তবে উটকিয়াগভিকের স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি জীবনযাত্রারই একটি স্বাভাবিক অংশ। তারা দীর্ঘ রাত যেমন উপভোগ করেন, তেমনি টানা আলোকোজ্জ্বল এই তিন মাসকেও উৎসবের আমেজে বরণ করে নেন।
