ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেই প্রশাসনিক সংস্কার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার ১১ মে ২০২৬ তারিখে নবান্নে তাঁর প্রথম কর্মদিবসে তিনি একাধিক উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠক পরিচালনা করেন। নবগঠিত বিজেপি সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাজ্যের উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নই হবে তাঁর প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষে তিনি যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। নবান্নের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মুখ্যমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের সাথে আলোচনায় সীমান্তে অমীমাংসিত জমি সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালান বন্ধে এটি একটি কঠোর বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে সীমান্তের অনেক অংশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ থমকে ছিল।
প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য একগুচ্ছ জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ থাকা বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প যেমন আয়ুষ্মান ভারত এবং প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও এবং উজ্জ্বলা যোজনার মতো প্রকল্পগুলোকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন যে, রাজ্যের প্রতিটি মানুষ যেন কেন্দ্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা তাঁর সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি এবং ঝুলে থাকা নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়েও তিনি সদিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন যে তাঁর সরকার কোনো বিশেষ দলের নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি নাগরিকের জন্য কাজ করবে। তিনি সুশাসন বা গুড গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। রাজ্যে নতুন করে জনগণনা কার্যক্রম শুরু করার বিষয়েও তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। তাঁর মতে, সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে বিজেপির প্রথম সরকার হিসেবে এই পরিবর্তনগুলো কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের এই দ্রুত ও সময়াবদ্ধ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও আশাবাদ দেখা দিচ্ছে।
বিকেল নাগাদ জেলা কর্মকর্তাদের সাথে অনুষ্ঠিত ভিডিও কনফারেন্সে মুখ্যমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার কঠোর নির্দেশ দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রশাসনিক কাজে কোনো ধরণের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নে গতি আনতে বিভিন্ন দপ্তরের সচিবদের সাথে তিনি আলাদাভাবে বৈঠক করেন। পশ্চিমবঙ্গের সীমানা রক্ষায় বিএসএফের সাথে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে এসেছে। শুভেন্দু অধিকারীর এই কর্মতৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরণের ওলটপালট হতে যাচ্ছে।
