সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হঠাৎ গণহারে পাকিস্তানি শ্রমিকদের তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের সোমবারের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা আবুধাবির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জেরেই আমিরাত কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানিদের জন্য তাদের শ্রমবাজার সংকুচিত করার পথে হাঁটছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত এই দুই দেশের সম্পর্কের ফাটল এখন পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর নতুন আঘাত হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানি শ্রমিকদের বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে যে, আমিরাতে কর্মরত পাকিস্তানি শিয়া সম্প্রদায়ের কর্মীদের ওপর খড়গ নেমে এসেছে। গত এক মাসে কয়েক হাজার কর্মীকে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই গ্রেপ্তার করে সরাসরি দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের ব্যক্তিগত মালামাল গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। নিউ ইয়র্ক টাইমস ২০ জনের বেশি এমন কর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে যারা দুবাই ও আবুধাবির বিভিন্ন কোম্পানিতে দীর্ঘ বছর ধরে বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইস্যুতে পাকিস্তানের নমনীয় অবস্থানই আমিরাত সরকারকে ক্ষুব্ধ করেছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই আমিরাত ভূখণ্ডে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। আবুধাবি চেয়েছিল পাকিস্তান যেন ইরানের বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেয়। কিন্তু ইসলামাবাদ মধ্যস্থতার পথ বেছে নেওয়ায় আমিরাত মনে করছে তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে পাকিস্তান যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। আবুধাবির আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমির সিনিয়র ফেলো হুসেইন হাক্কানি বিষয়টিকে এভাবে দেখছেন যে, আমিরাত অবাক হয়েছে কারণ পাকিস্তান তাদের সরাসরি সমর্থন দেয়নি, আর পাকিস্তান অবাক হয়েছে আমিরাতের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে।
আমিরাতের এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ কেবল শ্রমিক বিতাড়নেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত পাকিস্তানের কাছে তাদের পাওনা ৩৫০ কোটি ডলারের ঋণ দ্রুত ফেরত দেওয়ার দাবি তুলেছে। এই বিশাল অংকের অর্থ পাকিস্তানের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব এগিয়ে এসে পাকিস্তানের রিজার্ভ সচল রাখতে ৩০০ কোটি ডলার জমা রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান এখন সৌদি আরব এবং আমিরাতের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক দূরত্বের মাঝে আটকা পড়েছে। ইয়েমেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ইদানিং সৌদি ও আমিরাতের মধ্যে নীতিগত বিভেদ বাড়ছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই গণ-বিতাড়নের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করলেও বলেছে যে কেবল আইন ভঙ্গকারীদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে দুবাইয়ের পাকিস্তানি কনস্যুলেট থেকে দেওয়া নথিতে বিতাড়নের কারণ হিসেবে ‘জেলে থাকা বা পলাতক’ লিখে দেওয়া হলেও শ্রমিকদের দাবি তারা বৈধ ভিসাতেই কাজ করছিলেন। আমিরাতের অন্তত ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার জানিয়েছেন, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানি কর্মীদের ভিসা নবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে এবং নতুন ভিসা ইস্যু করাও স্থগিত রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পাকিস্তানের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, কারণ গত বছরও আমিরাত থেকে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।
