থাইল্যান্ডের আধুনিক রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা দীর্ঘ আইনি লড়াই ও নাটকীয়তার পর অবশেষে প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন। সোমবার ১১ মে ২০২৬ তারিখ সকালে ব্যাংককের ঐতিহাসিক ক্লোং প্রেম কারাগার থেকে তিনি যখন বের হন, তখন বাইরে অপেক্ষমাণ শত শত সমর্থক তাকে গগনবিদারি চিৎকারে স্বাগত জানান। লাল পোশাক পরিহিত এসব সমর্থকের মুখে ‘আমরা থাকসিনকে ভালোবাসি’ স্লোগানটি যেন দেড় দশকের রাজনৈতিক নির্বাসনের সমাপ্তি ঘোষণা করছিল। ৭৬ বছর বয়সী এই নেতাকে স্বাগত জানাতে তাঁর মেয়ে এবং বর্তমান থাই রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ পেটংটার্ন সিনাওয়াত্রাও উপস্থিত ছিলেন।
থাকসিন সিনাওয়াত্রার এই মুক্তি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কারাগার থেকে বের হওয়া নয়, বরং এটি থাইল্যান্ডের ভঙ্গুর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরণের মাইলফলক। প্রায় ১৫ বছর দেশের বাইরে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে তিনি সাহসিকতার সাথে দেশে ফিরেছিলেন। সে সময় বিমানবন্দরে নামার পরপরই তাঁকে দুর্নীতির পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আদালতের রায়ে তাঁর কয়েক বছরের কারাদণ্ড হলেও স্বাস্থ্যগত অবনতি এবং বয়সের কথা বিবেচনা করে তিনি বেশির ভাগ সময় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সোমবার সকালে তাঁকে সাদা পোশাকে বেশ প্রাণবন্ত অবস্থায় কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।
থাইল্যান্ডের ইতিহাসে থাকসিন সিনাওয়াত্রার প্রভাব অত্যন্ত গভীরে। তাঁর শাসনামলে নেওয়া বিভিন্ন জনমুখী নীতি ও স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার তাঁকে দেশটির গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে অঘোষিত দেবতায় পরিণত করেছিল। তবে রাজকীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক জান্তার সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে তাঁকে বারবার ক্ষমতাচ্যুত ও নির্বাসনে যেতে হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাঁর বর্তমান মুক্তি থাইল্যান্ডের বর্তমান শাসক দল ‘ফিউ থাই পার্টি’র জন্য নতুন শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়াবে। পেটংটার্ন সিনাওয়াত্রা তাঁর বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন এবং তাঁর হাত ধরেই থাকসিন পরিবার আবার থাই ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরতে চাইছে।
এই মুক্তির নেপথ্যে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা বা ‘ডিল’ থাকার জল্পনা অনেক আগে থেকেই রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, থাকসিনের দল ফিউ থাই পার্টির সাথে রক্ষণশীল সামরিক ও রাজতন্ত্রপন্থীদের একটি অলিখিত চুক্তি হয়েছে, যার মাধ্যমে রাজপরিবারের সাজা কমানোর অধিকার ব্যবহার করে তাঁর কারাবাস সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। এর বিনিময়ে ফিউ থাই পার্টি হয়তো বর্তমান রাজকীয় কাঠামোর প্রতি অনুগত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও থাকসিনকে প্যারোলের শর্ত হিসেবে কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে, তবে তাঁর শারীরিক উপস্থিতিও দেশটির বিরোধী শিবির এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরণের মেরুকরণ তৈরি করবে।
কারাগারের ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সমর্থকদের মধ্যে উম্মা কণ্ঠের পক্ষ থেকে কয়েকজনের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। তাদের মতে, থাকসিন কেবল একজন নেতা নন, বরং থাইল্যান্ডের আধুনিকায়নের কারিগর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয় নেতাকে কাছে পেয়ে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে সমালোচকদের মধ্যে ভিন্ন সুরও রয়েছে। অনেক বিরোধী গোষ্ঠী দাবি করছে যে, থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ কয়েদিরা পান না। আইনের শাসনের ক্ষেত্রে এটি একটি বৈষম্যমূলক উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে তারা মনে করেন। তবুও সোমবারের এই ঘটনা থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
