ইসলামের ইতিহাসের শুরুর দিকে আবু জাহেল, আবু লাহাব কিংবা কুরাইশ বংশের প্রভাবশালী নেতাদের ইসলাম বিরোধী অবস্থান কেবল রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত সংঘাত ছিল না। এর গভীরে ছিল এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক জাল, যা তাদের শৈশবের এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার সাথে জড়িয়ে ছিল। কেন তারা সত্য জানার পরও মূর্তিপূজা ত্যাগ করতে পারেননি, তার উত্তর লুকিয়ে আছে আরবের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ‘আমুল ফিল’ বা হস্তীবর্ষের মধ্যে। সীরাতে ইবনে হিশাম এবং ইতিহাসের অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, আবরাহার হস্তীবাহিনীর ধ্বংস মক্কার প্রবীণদের মনে এমন এক বদ্ধমূল ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করেছিল, যা পরবর্তী চল্লিশ বছর তাদের হৃদয়ে তাওহীদের আলো প্রবেশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
৫৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইয়েমেনের শাসক আবরাহা আল-আশরাম যখন কাবার পবিত্রতা ও মর্যাদা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে এক বিশাল হস্তীবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করতে আসে, তখন মক্কার কুরাইশদের সেই বাহিনীকে মোকাবিলা করার মতো কোনো সামরিক শক্তি ছিল না। তৎকালীন কুরাইশ নেতা আব্দুল মুত্তালিব তখন অসহায়ভাবে কাবার মালিকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। সেই ঘটনার পর আকাশ থেকে আসা আবাবিল পাখির মাধ্যমে আবরাহার সেই বিশাল বাহিনী ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই অলৌকিক ঘটনাটি যখন ঘটেছিল, তখন আবু জাহেল কিংবা আবু লাহাবের মতো নেতারা ছিলেন বয়সে তরুণ বা কিশোর। তারা তাদের চোখের সামনে দেখেছিলেন কীভাবে অলৌকিকভাবে কাবার সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছিল।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছিল এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি। সেই সময় কাবা ঘরের ভেতরে ও চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা ছিল। কুরাইশরা যখন দেখল যে কোনো মানবিক সাহায্য ছাড়াই আবরাহা ধ্বংস হয়ে গেল, তখন তাদের অবচেতন মন এই সুরক্ষার কৃতিত্ব কাবার রক্ষক হিসেবে পরিচিত সেই মূর্তিগুলোর ওপর চাপিয়ে দিল। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করল যে, তাদের দেবতারা কতই না শক্তিশালী! এই তথাকথিত দেবতাদের কারণেই হয়তো আবরাহার মতো পরাক্রমশালী রাজাও টিকতে পারেনি। এই একটি ঘটনা মক্কার সমাজপতিদের মনে মূর্তিপূজার প্রতি এমন এক অন্ধ এবং আবেগীয় ভক্তি তৈরি করল যা যুক্তির বাইরে চলে গিয়েছিল।
মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা স্বকীয় বিশ্বাসের প্রতিফলন। যখন চল্লিশ বছর পর মুহাম্মদ (সা.) নবুওয়াত লাভ করে মূর্তিপূজার অসারতা তুলে ধরলেন, তখন আবু জাহেলদের মনে সেই পুরনো স্মৃতির দৃশ্য ভেসে উঠল। তাদের কাছে মনে হলো, মুহাম্মদের (সা.) কথা তাদের সেই ‘চোখে দেখা সত্যের’ বিপরীত। তারা ভাবত, ‘যে মূর্তিরা আমাদের আবরাহার হাত থেকে রক্ষা করল, আজ সেগুলোকে ত্যাগ করলে আমরা তো অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ব।’ এই ভয় এবং শৈশবের গভীর আবেগীয় শিকড় তাদের সত্য গ্রহণে বাধা দিচ্ছিল। তারা ভাবত, যদি তারা এই দেবদেবীদের অস্বীকার করে, তবে মক্কার সুরক্ষা নষ্ট হয়ে যাবে এবং আবার কোনো আবরাহা এসে তাদের পিষে ফেলবে।
এর বিপরীতে, ইসলামের শুরুর দিকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন বয়সে তরুণ। হযরত আলী (রা.), তালহা (রা.) বা সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)—তাদের কারোরই বয়স তখন বিশের কোঠায় ছিল না। এই তরুণ প্রজন্মের কাছে আবরাহার ঘটনাটি ছিল স্রেফ ইতিহাসের একটি গল্প মাত্র। তাদের মনে মূর্তিপূজার সেই দীর্ঘস্থায়ী আবেগের বন্ধন বা মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা ছিল না। ফলে যখনই তারা তাওহীদের যৌক্তিক এবং ফিতরাতসম্মত দাওয়াত পেলেন, তারা কোনো বাধা ছাড়াই তা গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। তরুণদের মন ছিল উর্বর এবং খোলা, কিন্তু প্রবীণদের মন ছিল তাদের অভিজ্ঞতার কারাগারে বন্দি।
আবু জাহেলের মতো নেতাদের ইসলাম গ্রহণ না করার পেছনে তাদের সামাজিক অহংকার বা ইগো-ও একটি বড় কারণ ছিল। তারা মনে করত যে, যদি তারা একজন তরুণ এতিম মুহাম্মদের (সা.) আনুগত্য স্বীকার করে নেয়, তবে তাদের দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব এবং বংশীয় মর্যাদা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এই ক্ষমতার মোহ এবং আবরাহার ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা মিলে তাদের এমন এক অন্ধকারে আটকে দিয়েছিল যেখান থেকে বেরিয়ে আসা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তারা নিজেদের স্বার্থ এবং ভ্রান্ত বিশ্বাসকে রক্ষা করতে গিয়ে সত্যের স্পষ্ট আলোকেও অস্বীকার করে বসল।
মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত এই দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব কুরাইশদের মধ্যে বজায় ছিল। যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কায় বিজয়ী বেশে প্রবেশ করলেন এবং কাবার ভেতরে থাকা ৩৬০টি মূর্তি একে একে নিজের লাঠি দিয়ে ভেঙে ফেললেন, তখন প্রবীণদের মনে এক চরম বিস্ময় এবং ভীতি তৈরি হয়েছিল। সহীহ আল-বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, আবু সুফিয়ান কিংবা আবু কুহাফার মতো প্রবীণরা ভাবছিলেন যে হয়তো আজ বড় কোনো গজব নেমে আসবে। কারণ তাদের মনের সেই ৪০ বছরের পুরনো ভয় তখনো কাটেনি। কিন্তু যখন দেখা গেল সব মূর্তি ভেঙে ফেলার পরও কিছুই ঘটল না, আকাশ ভেঙে পড়ল না এবং পৃথিবীও ওলটপালট হলো না, তখন তাদের সেই দীর্ঘদিনের ভুল বিশ্বাস চোখের পলকে ধুলোয় মিশে গেল।
মূর্তিগুলোর এই অসহায়ত্ব দেখে মক্কার মানুষ বুঝতে পারল যে, আবরাহার ধ্বংস মূর্তিদের কারণে নয়, বরং তা ছিল একমাত্র আরশের মালিক আল্লাহর কুদরত। এই উপলব্ধি আসার পরই তারা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করতে শুরু করল, যা সূরা নাসরে বর্ণিত হয়েছে। আবু জাহেল এই সত্য দেখার সুযোগ পায়নি, কারণ সে তার কুসংস্কার নিয়েই বদরের প্রান্তরে মারা গিয়েছিল। তার ঘটনা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, অন্ধ অনুকরণ এবং ভুল অভিজ্ঞতা অনেক সময় মানুষের বোধশক্তিকে পঙ্গু করে দেয়। সত্যকে চিনতে হলে হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলতে হয় এবং পূর্বপুরুষদের ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সাহস সঞ্চয় করতে হয়।
এই ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ আমাদের বর্তমান সমাজের জন্যও প্রাসঙ্গিক। অনেক সময় আমরা আমাদের পারিবারিক প্রথা বা কুসংস্কারকে ধর্মের চেয়ে বড় করে দেখি, কেবল এই কারণে যে আমাদের পূর্বপুরুষেরা তা পালন করে এসেছেন। আবু জাহেলের জীবনের এই মনস্তাত্ত্বিক রহস্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যের মাপকাঠি আবেগ বা পুরনো স্মৃতি নয়, বরং তা হলো আল্লাহ প্রদত্ত ওহী এবং যুক্তি। সত্য যখন সামনে আসে, তখন সব ধরনের গোঁড়ামি এবং শৈশবের ভুল ধারণাকে বিসর্জন দেওয়াই হলো প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুসংস্কারমুক্ত বিশুদ্ধ তাওহীদী চেতনা দান করুন।
