মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

পরিবার বিচ্ছেদ ও নির্বাসন: পেনসিলভানিয়ায় এক মায়ের লড়াই

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১২, ২০২৬, ১২:২০ এএম

পরিবার বিচ্ছেদ ও নির্বাসন: পেনসিলভানিয়ায় এক মায়ের লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ওয়েস্ট স্ক্র্যান্টন শহরের একটি শান্ত এলাকা। প্রতিদিনের মতোই জীবন কাটছিল আইদা তেনেজাকার। কিন্তু গত ১০ মে ২০২৬ তারিখের এক ভোরবেলা তাঁর পুরো পৃথিবী ওলটপালট হয়ে যায়। আইদা তখন গাইসিঙ্গার কমিউনিটি মেডিকেল সেন্টারে একজন পেশেন্ট ইনটেক ক্লার্ক হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক চাকরির ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তার আগের দিনই অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাঁর স্বামী ভার্জিলিও লেমাকে আটক করে। বর্তমানে স্বামীর অনুপস্থিতিতে দুই ছোট মেয়ে ভিক্টোরিয়া এবং আনাকে নিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন এই মা। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে কঠোর অভিবাসন নীতি কীভাবে একটি সাজানো পরিবারকে মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিতে পারে, আইদার জীবন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।

ঘটনার আগের রাতে পেশায় গুদামঘর কর্মী আইদা তাঁর আসন্ন ইন্টারভিউ নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। স্বামী লেমা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন এবং সফল হওয়ার জন্য সাহস জুগিয়েছিলেন। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার পরপরই যখন লেমা কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন আইদা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে এটিই হতে যাচ্ছে তাঁদের শেষ দেখা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই লেমার ফোন আসে এবং তিনি জানান যে তাঁকে অভিবাসন এজেন্টরা আটক করেছে। লেমা ১৫ বছর বয়সে টেক্সাস সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। ২০১৬ সালে একটি আদালতের শুনানিতে উপস্থিত না হওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আগে থেকেই আইনি জটিলতা ছিল, যা এই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর বহিষ্কারকে নিশ্চিত করে তোলে।

আইদা এবং লেমার সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ভালোবাসা আর পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ। অনলাইনে পরিচিত হওয়ার পর তাঁরা স্ক্র্যান্টনে বসতি স্থাপন করেন। উচ্চশিক্ষার চেয়ে পরিবারকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া আইদার এই সিদ্ধান্তে লেমার পূর্ণ সমর্থন ছিল। তবে লেমার অভিবাসন মর্যাদা নিয়ে আইদার মনে সবসময় এক চাপা আতঙ্ক কাজ করত। লেমা আইনের মারপ্যাঁচ খুব একটা বুঝতেন না, আর সেই অসচেতনতাই আজ তাঁকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আইদা এখন স্ক্র্যান্টনের সেই বাড়িতে একা হাতে সন্তানদের সামলাচ্ছেন এবং একই সাথে গুদামঘরের কঠোর পরিশ্রম করছেন। যে চাকরির ইন্টারভিউটির জন্য তিনি এত প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার কারণে সেখানে আর যাওয়া হয়নি তাঁর।

বর্তমানে আইদা স্বামীর স্মৃতি বলতে কেবল কিছু মুদ্রিত আলোকচিত্রকেই আঁকড়ে ধরে আছেন। এই ছবিগুলো তিনি মূলত লেমাকে বৈধ বাসিন্দা হিসেবে ফিরিয়ে আনার জন্য করা ‘আই-১৩০’ আবেদনের প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়ার জন্য তৈরি করেছিলেন। এই আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। এই দীর্ঘ অপেক্ষায় আইদাকে তাঁর সন্তানদের প্রতিটি মাইলফলক একাই প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। ছোট মেয়ে আনা যখন প্রথম হাঁটতে শিখল, লেমা সেই মুহূর্তটি দেখতে পাননি। আইদা ফোনে সেই ভিডিও পাঠিয়ে এবং নিয়মিত কথা বলে স্বামীকে পরিবারের সাথে যুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব আর আইনি দেয়াল তাঁদের মাঝে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে।

আইদা তেনেজাকা মনে করেন, তাঁর স্বামী হয়তো আইনি পথে আসেননি, কিন্তু যেভাবে তাঁদের পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অমানবিক। যুক্তরাষ্ট্রে এখন হাজার হাজার পরিবার লেমা এবং আইদার মতো পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। অভিবাসন আইনের কঠোর প্রয়োগ অনেক সময় অপরাধীদের ধরার বদলে সাধারণ কর্মজীবী মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করছে, যারা বছরের পর বছর ধরে একটি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে আসছে। আইদা হার মানতে রাজি নন; তিনি আশা করেন একদিন তাঁর সন্তানদের বাবা আবার ঘরে ফিরে আসবেন। তবে সেই দিনটি কবে আসবে, তা পেনসিলভানিয়ার এই প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে এখনো অনিশ্চিত।

banner
Link copied!