বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে কৃষকরা এখন মাটির গুণাগুণ বোঝার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। মাটিতে নাইট্রোজেন এবং ফসফরাসের মতো পুষ্টি উপাদানের সঠিক মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে সারের ব্যবহার অপ্টিমাইজ বা সাশ্রয়ী করা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কৃষি উপকরণের আকাশছোঁয়া দামের কারণে কৃষকরা এখন হিসাব কষে চাষাবাদ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ডিজেল জ্বালানি এবং নাইট্রোজেন সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক কৃষক এখন যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ পিছিয়ে দিচ্ছেন অথবা কীটনাশক ও সারের প্রয়োগ কমিয়ে দেওয়ার মতো কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। চাষাবাদের প্রথাগত পদ্ধতি বদলে এখন বৈজ্ঞানিক উপায়ে খরচ কমানোর লড়াই চলছে মাঠ পর্যায়ে।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম অ্যাগ্রিলাইফ এক্সটেনশন সার্ভিসের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অর্থনীতিবিদ ডিডি জোনস বর্তমানে উৎপাদনকারীদের সাথে মুনাফা বজায় রাখার বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। তাঁর মতে এবারের মৌসুমে চাষাবাদের জন্য কোনো জাদুকরী সমাধান বা সিলভার বুলেট নেই যা দিয়ে রাতারাতি ভাগ্য বদলে ফেলা যাবে। ইনপুট খরচের দিক থেকে বিচার করলে ছোট ছোট সমন্বয় বা মাটির প্রয়োজন অনুযায়ী সারের ব্যবহারই এখন কৃষকদের একমাত্র বাঁচার পথ। জোনস মনে করেন যে মাটিতে আগে থেকেই যে পরিমাণ নাইট্রোজেন অবশিষ্ট থাকে তা কাজে লাগাতে পারলে উৎপাদন খরচ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। এই বাস্তবতায় মাটির পরীক্ষার চাহিদা আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল বা মিডওয়েস্টে গত কয়েক বছরে মাটির পরীক্ষার প্রতি কৃষকদের আগ্রহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি পরামর্শক ডেভিস। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কৃষকরা এখন অন্ধভাবে সার প্রয়োগ না করে মাটির প্রকৃত চাহিদা বুঝতে চাইছেন। তবে অনেক কৃষক খরচ কমাতে এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছেন যে তারা সরাসরি সারের ব্যবহার প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। আমেরিকান ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে নাইট্রোজেন সারের দাম প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। এর ফলে যারা আগে থেকে সার মজুত করতে পারেননি তারা এখন চরম বিপাকে পড়েছেন।
জ্বালানি তেলের বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে গত এক বছরের ব্যবধানে ডিজেল প্রতি গ্যালনে প্রায় ২ ডলার বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের রিপোর্ট বলছে যে ইরান যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধের ফলে জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অথচ ২০২৬ সালের শুরুতে কৃষি অর্থনীতিবিদরা যখন পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তখন এই যুদ্ধের প্রভাব তাঁদের হিসেবে ছিল না। পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর কমার্শিয়াল এগ্রিকালচারের পরিচালক অধ্যাপক মাইকেল ল্যাঞ্জমেয়ার এই পরিস্থিতিকে সিস্টেমের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন যে নগদ প্রবাহের পরিকল্পনা বা ক্যাশ ফ্লো প্রোজেকশন এই যুদ্ধের কারণে পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালির এই সংকট কেবল জ্বালানি নয় বরং সার তৈরির কাঁচামাল সরবরাহেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকরা এখন তাঁদের বাজেটে সারের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ মাটির পরীক্ষায় ব্যয় করছেন যাতে প্রতিটি দানার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে যদি এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত না হয় তবে খাদ্য উৎপাদনে এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আপাতত কৃষকরা ছোট ছোট সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই কঠিন সময় পার করার চেষ্টা করছেন। তবে সারের উচ্চমূল্য এবং জ্বালানি সংকট ২০২৬ সালের কৃষি মুনাফাকে অত্যন্ত সংকীর্ণ করে তুলেছে যা বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
