মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রিয় নবীজির বিচার ব্যবস্থা: সাহাবী হত্যার ৫টি নজিরবিহীন বদলা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১১, ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম

প্রিয় নবীজির বিচার ব্যবস্থা: সাহাবী হত্যার ৫টি নজিরবিহীন বদলা

ছবি - Ai

বর্তমান বিশ্বে বিচারহীনতা এবং অপরাধীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার সংস্কৃতি যখন সাধারণ মানুষকে হতাশ করে তুলছে, তখন ইতিহাসের পাতা থেকে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন আমাদের জন্য এক অনন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। কেন বিচার হচ্ছে না কিংবা কেন অন্যায়ের প্রতিবাদ দৃশ্যমান হচ্ছে না—এমন প্রশ্ন যখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন আমাদের ফিরে তাকাতে হবে চৌদ্দশ বছর আগেকার সেই আরবে। সেখানে প্রিয় নবীজি (সা.) তাঁর প্রাণপ্রিয় সাহাবীদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে দেখেছিলেন এবং প্রতিটি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তিনি এমন কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন যা আজও বিশ্ববাসীর জন্য ন্যায়বিচারের মাপকাঠি হয়ে আছে।

ইসলামের ইতিহাসের প্রথম রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল মক্কায়, যখন মুসলিমরা ছিল চরম দুর্বল ও সংখ্যালঘু। ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা.) এবং তাঁর স্বামী ইয়াসির (রা.)-কে যখন আবু জাহেল অত্যন্ত অমানবিক ও নির্মমভাবে বর্শা বিদ্ধ করে হত্যা করেছিল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়। তিনি সেই মুহূর্তে আবেগপ্রবণ হয়ে মক্কায় অবস্থানরত মুষ্টিমেয় মুসলিমদের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দেননি। বরং তিনি ইয়াসিরের পরিবারকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইনের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি ছিল পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় গৃহীত এক আধ্যাত্মিক প্রতিবাদ, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় শক্তি না থাকলে ধৈর্যের মাধ্যমেই ঈমান রক্ষা করা প্রথম দায়িত্ব।

মদিনায় হিজরতের পর যখন মুসলিমরা একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো পেল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পদক্ষেপের ধরন পরিবর্তিত হয়। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ‍‍`বি‍‍`রে মাউনা‍‍`-র সেই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। বিশ্বাসঘাতক আমির ইবনে তুফাইল যখন ৭০ জন হাফেজে কুরআন সাহাবীকে অত্যন্ত জঘন্যভাবে শহীদ করেছিল, তখন রাসূল (সা.) এতটাই মর্মাহত হয়েছিলেন যে তিনি দীর্ঘ এক মাস যাবৎ ফজরের নামাজের পর ‍‍`কুনুতে নাজেলা‍‍` পাঠ করে খুনিদের জন্য বদদোয়া করেছিলেন। সহীহ আল-বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, এটি ছিল একজন রাষ্ট্রনায়কের পক্ষ থেকে খুনিদের বিরুদ্ধে প্রথম আধ্যাত্মিক ও কূটনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা। তিনি আল্লাহর দরবারে বিচার দায়ের করার পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ শোক পালনের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

সাহাবীদের জান-মালের নিরাপত্তা রক্ষায় রাসূল (সা.) কতটা কঠোর ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়। যখন গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে কুরাইশরা হযরত উসমান (রা.)-কে হত্যা করেছে, তখন রাসূল (সা.) মক্কার সীমানায় বসে প্রায় ১৫০০ সাহাবীর কাছ থেকে মৃত্যুর শপথ বা ‍‍`বাইআতুর রিদওয়ান‍‍` গ্রহণ করেছিলেন। একজন মাত্র সাহাবীর রক্তের বদলা নিতে তিনি তৎকালীন পরাক্রমশালী কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে দ্বিধা করেননি। যদিও পরবর্তীতে জানা যায় উসমান (রা.) জীবিত আছেন, কিন্তু রাসূল (সা.)-এর সেই কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মুমিনের রক্তের মর্যাদা কাবা শরীফের চেয়েও বেশি। এই শপথের কথা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ফাতহে উল্লেখ করে মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে রাসূল (সা.)-এর পদক্ষেপ ছিল আরও ভয়ংকর ও দৃষ্টান্তমূলক। অষ্টম হিজরিতে যখন রোমান সম্রাটের অধীনস্থ গভর্নর শুরাহবিল ইবনে আমর রাসূল (সা.)-এর দূত হারিস ইবনে উমাইর (রা.)-কে শহীদ করে, তখন তিনি তৎকালীন বিশ্বের পরাশক্তি রোমানদের বিরুদ্ধে ৩,০০০ সৈন্যের বাহিনী প্রেরণ করেন। ইতিহাসে এটিই ছিল মুতার যুদ্ধ। যেখানে একজন সাধারণ দূতের রক্তের বিচার নিশ্চিত করতে রাসূল (সা.) তিনজন অভিজ্ঞ সেনাপতি নিয়োগ করেছিলেন এবং অসম যুদ্ধে নিজের প্রিয় সাহাবীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সুন্নাহ এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করাই হলো প্রকৃত বীরত্ব।

সবশেষে মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপট আমাদের শিখিয়ে দেয় যে মৈত্রী চুক্তি রক্ষার জন্য মুসলিমরা কতটা আপোষহীন হতে পারে। যখন বনু বকর গোত্র কুরাইশদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রাসূল (সা.)-এর মিত্র গোত্র বনু খুজাআ-র ওপর হামলা চালিয়ে হারাম শরীফের ভেতরেও রক্তপাত ঘটায়, তখন রাসূল (সা.)-এর ক্রোধ ছিল আকাশছোঁয়া। তিনি সরাসরি ঘোষণা করেছিলেন যে যদি তিনি বনু খুজাআ-কে সাহায্য না করেন তবে আল্লাহও তাঁকে সাহায্য করবেন না। এই একটি ঘটনার বিচার ও প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই ১০,০০০ সাহাবীর সেই ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়েছিল। সীরাতে ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূল (সা.) প্রমাণ করেছিলেন যে মুসলিমরা তাদের মিত্রদের রক্ত বৃথা যেতে দেয় না।

এই পাঁচটি ঐতিহাসিক ঘটনা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, সময়ের সাথে সাথে পদক্ষেপের ধরন পাল্টালেও ন্যায়বিচারের মূলনীতি থেকে রাসূল (সা.) এক চুলও বিচ্যুত হননি। মক্কায় দুর্বল অবস্থায় তিনি সবর করেছেন, মদিনায় স্থিতিশীল অবস্থায় কুনুতে নাজেলা পড়েছেন এবং রাষ্ট্রশক্তি অর্জনের পর যুদ্ধের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করেছেন। প্রিয় নবীজি (সা.)-এর সীরাত আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে অন্যায় ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তার প্রতিকার করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। আজকের দিনেও যদি আমরা রাসূল (সা.)-এর আদর্শের দাবিদার হই, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রে জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং মজলুমের বিচার নিশ্চিত করাই হতে হবে আমাদের প্রধান ব্রত। আল্লাহ আমাদের সকলকে সাহাবীদের ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করার এবং রাসূলের (সা.) ইনসাফ কায়েম করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

banner
Link copied!