আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে অনেক অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক বিষয়কে কেবল কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে বদনজর বা কুদৃষ্টি কোনো নিছক কাল্পনিক বিষয় নয় বরং এটি একটি প্রমাণিত সত্য যা মানুষের জীবন ও ভাগ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সাধারণ অর্থে কারো প্রতি কারো অতিরিক্ত প্রশংসা বা ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টির ফলে যে ক্ষতি হয় তাকেই বদনজর বলা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে এই বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য বারবার সতর্ক করেছেন এবং এর প্রতিকারও বাতলে দিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে বদনজরের সত্যতা তুলে ধরা হয়েছে। সুরা ইউসুফের ৬৭ নম্বর আয়াতে আমরা দেখতে পাই নবী ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তানদের মিসরে প্রবেশের সময় একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি বলেছিলেন যে তাঁর এগারোজন সন্তান যেন শহরের একই প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ না করে বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করে। ইতিহাস ও তাফসিরবিদদের মতে ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সন্তানরা ছিলেন অত্যন্ত সুশ্রী ও শক্তিশালী। এক সঙ্গে এতগুলো সুদর্শন যুবককে দেখলে মানুষের কুদৃষ্টি পড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি এই সাবধানতা অবলম্বন করেছিলেন। তিনি জানতেন যে আল্লাহর বিধানের বাইরে কেউ রক্ষা করতে পারে না তবে জাগতিক সতর্কতা হিসেবে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বদনজর যে কতটা শক্তিশালী হতে পারে তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বিখ্যাত হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছেন যে অশুভ দৃষ্টি বা বদনজর সত্য এবং এটি মানুষের ভাগ্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি তিনি এমন কঠোর ভাষাও ব্যবহার করেছেন যে বদনজর একজন সুস্থ মানুষকে কবরে এবং একটি শক্তিশালী উটকে রান্নার পাতিলে প্রবেশ করিয়ে ছাড়তে পারে। এর মানে হলো কুদৃষ্টির প্রভাব কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে। মুসলিম শরীফের অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে যদি কোনো বিষয় তাকদির বা ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারত তবে তা হতো বদনজর।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সাহাবীদের মধ্যেও এমন ঘটনার নজির রয়েছে। সাহাবী আমির বিন রাবিআ যখন সাহল ইবনে হুনাইফকে গোসল করতে দেখেন এবং তাঁর শরীরের সৌন্দর্যের প্রশংসা করেন ঠিক তখনই সাহল সেখানে লুটিয়ে পড়েন। তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে মাথা তোলার শক্তিও হারান। খবরটি যখন নবীজির কাছে পৌঁছাল তখন তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। তিনি আমির বিন রাবিআকে উদ্দেশ্য করে বললেন যে তোমরা কেন নিজেদের ভাইকে হত্যা করছ? কারো কোনো সুন্দর জিনিস দেখলে কেন তোমরা বরকতের দোয়া করলে না? এরপর নবীজি সাহলকে সুস্থ করার জন্য আমির বিন রাবিআকে বিশেষ পদ্ধতিতে ধৌত করা পানি দিয়ে গোসল করানোর নির্দেশ দেন এবং আল্লাহর রহমতে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
বদনজরের প্রভাব থেকে বাঁচতে ইসলাম আমাদের সচেতনতা ও বিনয় প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের ফলে মানুষ নিজের ব্যক্তিগত অর্জন পোশাক পরিচ্ছদ খাবার বা সন্তান সন্ততির ছবি খুব বেশি প্রদর্শন করে থাকে। এটি অনেক সময় অন্যের মনে হীনম্মন্যতা বা সূক্ষ্ম ঈর্ষার জন্ম দেয় যা অজান্তেই বদনজরের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শনী এড়িয়ে চলা এবং সাধারণ জীবনযাপন করা বদনজর থেকে বাঁচার একটি বড় মাধ্যম। এছাড়া যখনই কোনো সুন্দর কিছু চোখে পড়ে তখন ‘মাশাআল্লাহ’ বা ‘বারাকাল্লাহ’ বলার অভ্যাস করা উচিত। এতে করে ওই জিনিসের ওপর কুদৃষ্টির প্রভাব পড়ে না বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত নাজিল হয়।
বদনজর থেকে আত্মরক্ষার জন্য নিয়মিত মাসনুন দোয়া ও জিকির করা অত্যন্ত জরুরি। সকাল ও সন্ধ্যার জিকির বিশেষ করে সুরা ইখলাস সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করা বদনজর থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে বড় ঢাল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুমাকে দোয়া পড়ে ফুঁ দিতেন যা ছিল কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য একটি বিশেষ আমল। যদি কারো বদনজর লেগে যায় তবে ওপরের ঘটনার মতো দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করা বা ওই ব্যক্তির ব্যবহৃত পানি দিয়ে গোসল করা ইসলামের একটি অনুমোদিত চিকিৎসা পদ্ধতি।
পরিশেষে এটি স্পষ্ট যে বদনজর কোনো কাল্পনিক আতঙ্ক নয়। এটি আমাদের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো সব সময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজের নিয়ামতগুলোকে রাখা। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় এবং অন্যের কল্যাণের জন্য দোয়া করার মাধ্যমেই একটি সুন্দর ও নিরাপদ জীবন গঠন করা সম্ভব। বদনজর থেকে বাঁচতে যেমন দোয়া ও জিকির প্রয়োজন তেমনি নিজের আচার আচরণে সংযত হওয়া এবং লৌকিকতা পরিহার করাও অপরিহার্য।
