যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বিবিসির সাবেক সংবাদ প্রধান ফ্র্যান আনসওয়ার্থ এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কর্মরত চরমপন্থী ট্রান্সজেন্ডার কর্মীদের তীব্র প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি তার শীর্ষ পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার বছর বিবিসির নিউজ ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব প্রথম বারের মতো নিজের পদত্যাগের পেছনের প্রকৃত কারণ প্রকাশ্যে এনেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে প্রগতিশীল এজেন্ডাধারী এবং নির্দিষ্ট জেন্ডার মতাদর্শের অনুসারী সহকর্মীদের একতরফা বুলিংয়ের কারণে ডেস্কে স্বাধীনভাবে কাজ করা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
এই নতুন তথ্য বিশ্ববিখ্যাত এই গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ সম্পাদকীয় নিরপেক্ষতার কঙ্কালকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে।
সাবেক সহকর্মী রব বার্লির সাথে অনলাইন ম্যাগাজিন ‘আনহার্ড’-এ প্রকাশিত একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে আনসওয়ার্থ স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে তার দায়িত্ব পালনকালে বিবিসির নিউজ ডিভিশন দিন দিন পুরোপুরি অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে উঠছিল। তিনি বলেন, এটি ছিল এক ধরনের নিয়মতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক বুলিং, যা কেবল একটি নির্দিষ্ট ট্রান্স ইস্যুতে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রগতিশীল মানসিকতার কর্মীরা অন্য কোনো ভিন্ন মতাদর্শ বা বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি শুনতে সম্পূর্ণ নারাজ ছিলেন এবং কেউ তাদের এজেন্ডার বাইরে কথা বলতে চাইলে তাকে সরাসরি ‘নো-প্ল্যাটফর্ম’ করে দেওয়া হতো। এর ফলে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের যে মৌলিক চরিত্র, তা বজায় রাখা বিবিসির সংবাদ বিভাগের জন্য চরম কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিলেন যে বিবিসি ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিতর্কিত এলজিবিটিকিউ দাতব্য সংস্থা ‘স্টোনওয়াল’-এর ডাইভারসিটি চ্যাম্পিয়নস স্কিমের সাথে যুক্ত ছিল, যা তাদের সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আনসওয়ার্থের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই মতাদর্শগত বন্দিত্বের অভিযোগকে আরও বেশি শক্তিশালী করল। তিনি স্বীকার করেছেন যে বিভিন্ন প্রোগ্রামের সংবাদ সম্পাদকেরা তাদের নিজেদের সহকর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত বা সমালোচিত হওয়ার ভয়ে ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুগুলোর ওপর কোনো ধরনের সমালোচনামূলক বা নিরপেক্ষ প্রতিবেদন তৈরি করা থেকে বিরত থাকতেন। নাটক ও বিনোদন বিভাগের কর্মীরা সংবাদ বিভাগকে একটি ‘মনো-পার্সপেক্টিভ’ বা একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার জন্য প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করতেন।
গত বছর ব্রিটেনের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ একটি অভ্যন্তরীণ মেমো ফাঁস করেছিল, যা বিবিসির সম্পাদকীয় মানদণ্ড বিষয়ক উপদেষ্টা মাইকেল প্রেসকটের লেখা ছিল। সেই গোপন নথিতে প্রেসকট স্পষ্ট অভিযোগ করেছিলেন যে বিবিসির ট্রান্স-সংক্রান্ত সংবাদগুলো মূলত প্রতিষ্ঠানের বিশেষায়িত এলজিবিটি সাংবাদিকদের দ্বারা ‘কার্যকর সেন্সরশিপ’-এর শিকার হয়েছে। এই জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝেই আগামী সপ্তাহে গুগলের সাবেক নির্বাহী ম্যাট ব্রিটিন বিবিসির নতুন ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে আনসওয়ার্থ মুখ খোলার মাধ্যমে এই ট্রান্স অ্যাক্টিভিজম ও বিবিসির ভেতরের গল্প নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছেন।
নিজের অবস্থান ডিফেন্ড করে আনসওয়ার্থ সাক্ষাৎকারে বলেন, এই সমস্যাটি কেবল বিবিসির একা ছিল না, বরং তৎকালীন সময়ে এটি একটি ‘প্রগতিশীল উন্মাদনা’ হিসেবে সমাজের প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করেছিল। সারা বিশ্বই যেন এক ধরনের সামষ্টিক উন্মাদনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এবং একটি জাতীয় স্তরের বুলিং বা আধিপত্যবাদী পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যার ছোঁয়া স্বাভাবিকভাবেই বিবিসির ওপরেও এসে পড়েছিল। তিনি দাবি করেন যে তিনি এই চরমপন্থী কর্মীদের সমস্ত দাবির কাছে সম্পূর্ণ নতি স্বীকার করেননি, তবে এটিও সত্য যে তৎকালীন সময়ে তাদের বিরুদ্ধে আরও অনেক বেশি কঠোর ও শক্তিশালী অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল।
তার মেয়াদে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রথম বারের মতো একটি বিশেষায়িত ‘এলজিবিটি করেসপন্ডেন্ট’ পদ তৈরি করা হয়েছিল, যা পরবর্তী বছরগুলোতে একতরফা প্র্রো-ট্রান্স এজেন্ডা প্রচার করতে এবং বিপরীত চিন্তাধারাকে সম্প্রচার থেকে দূরে রাখতে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে মাইকেল প্রেসকট তার মেমোতে উল্লেখ করেন। ২০২১ সালের নভেম্বরে একটি অভ্যন্তরীণ সভায় বিবিসির তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল কর্মীদের সতর্ক করে বলেছিলেন যে বিবিসিকে কোনোভাবেই ট্রান্সফোবিক হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা যাবে না। সেই একই মিটিংয়ে আনসওয়ার্থ নিজেও বলেছিলেন যে তাদের সংবাদে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের মতামত অনেক বেশি পরিমাণে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এখন তিনি স্বীকার করছেন যে সংবাদ সম্পাদকেরা এই স্পর্শকাতর বিষয়ে হাত দিতেই ভয় পেতেন কারণ এর পরেই তাদের ওপর প্রচণ্ড প্রাতিষ্ঠানিক আক্রমণ নেমে আসত।
যদিও আনসওয়ার্থ দাবি করেছেন যে স্টোনওয়াল সরাসরি তাদের সম্পাদকীয় আউটপুট নিয়ন্ত্রণ করেনি, তবে তিনি এটি মেনে নিয়েছেন যে সংস্থাটির জেন্ডার-অ্যাফার্মিং মতাদর্শ পুরো নিউজরুমের আবহাওয়াকে সম্পূর্ণ গ্রাস করেছিল। সবাই এক ধরনের অলিখিত সামাজিক ফেনোমেনন বা ‘বি কাইন্ড’ বা সদয় হওয়ার স্রোতে ভেসে যাচ্ছিলেন, যা সাংবাদিকতার মূল নীতি ও বস্তুনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে এই সংকটের আরেকটি বড় কারণ ছিল এই বিষয়ের মূল তথ্য ও প্রমাণগুলো নিজেদের মধ্যেই প্রচণ্ডভাবে বিতর্কিত ছিল, যার কারণে একটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে সাংবাদিকতা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
