শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩

ব্রিটিশ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সংকট: নতুন খাতের খোঁজে যুক্তরাজ্য

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৬, ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম

ব্রিটিশ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সংকট: নতুন খাতের খোঁজে যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে উদ্ভাবন ও মেধার বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির নতুন ও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিপক্বতা পাওয়ার আগেই বিদেশী মালিকানায় চলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ক্লাস্টার থেকে শুরু করে উত্তরের গ্রাফিন ল্যাবরেটরি পর্যন্ত ব্রিটেনের মেধার ঘনত্ব বিশ্বের অন্যতম সেরা। বর্তমানে দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম হওয়া সত্ত্বেও এই ব্রিটিশ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সংকট দেশীয় উদ্ভাবকদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

স্টার্ট-আপগুলো বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন বা স্কেল-আপ ক্যাপিটাল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বিদেশের দিকে ঝুঁকছে।

অনেক সফল উদ্যোক্তা তাদের শতভাগ ব্রিটিশ অর্থায়নে গড়ে ওঠা কোম্পানিকে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। যখন এই বড় অঙ্কের বিদেশী মূলধন আসে, তখন তার সাথে কিছু কঠোর শর্তও যুক্ত থাকে—যেমন কোম্পানির বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (IP) স্থানান্তর বা কৌশলগত সদর দফতর অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া। এটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠাতা বা উদ্ভাবকদের মেধার অভাব নয়, বরং যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ মূলধন বাজারের একটি কাঠামোগত অমিল। এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ডাউনিং স্ট্রিটকে অবশ্যই জাতীয় সঞ্চয় এবং আমাদের চঞ্চল উদ্ভাবকদের মধ্যকার এই বিশাল ব্যবধানটি দূর করতে হবে।

যুক্তরাজ্যের মূলধন বাজারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের প্রতি চরম অনীহা বা কম ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা। এর বড় প্রমাণ হলো ব্রিটিশ সঞ্চয়কারীরা তাদের ব্যক্তিগত আইএসএ (ISA) অ্যাকাউন্টগুলোতে প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি নগদ অর্থ অলস ফেলে রেখেছেন। যদিও এই অ্যাকাউন্টগুলো সঞ্চয়কারীদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, কিন্তু বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এই অর্থের প্রকৃত মূল্য দিন দিন কমছে। এই বিশাল তহবিলের একটি ছোট অংশও যদি নিয়ন্ত্রিত ফান্ডের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় স্টার্ট-আপ ও স্কেল-আপ ব্যবসায় চালিত করা যেত, তবে তা বেসরকারি খাতের জন্য একটি বড় রূপান্তর বয়ে আনতে পারত।

এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে খুব ব্যয়বহুল কোনো কাঠামোর প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন কেবল একটি কর-সুবিধাপ্রাপ্ত ‘স্কেল-আপ আইএসএ’ যা নাগরিকদের দেশের ভবিষ্যৎ সাফল্যের পেছনে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে ব্রিটেনের পেনশন ব্যবস্থা বিশ্বের বৃহত্তমগুলোর একটি, যার হাতে প্রায় ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন পাউন্ডের সম্পদ রয়েছে। গত বছরের ম্যানশন হাউস অ্যাকর্ড অনুযায়ী ১৭টি বড় পেনশন ফান্ড অভ্যন্তরীণ সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াতে সম্মত হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন এখনো অনেক ধীর। ডাউনিং স্ট্রিট যদি পেনশন প্রদানকারীদের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কর প্রণোদনা দেয়, তবে দেশীয় এসএমই (SME) খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্তরের বৈশ্বিক সম্পদ আকর্ষণ করার পদ্ধতি নিয়েও ট্রেজারিকে নতুন করে ভাবতে হবে। একটি প্রস্তাবিত ‘প্রোডাক্টিভ ক্যাপিটাল ভিসা’ এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যা বিদেশী সম্পদকে সরাসরি যুক্তরাজ্যের সক্রিয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন উৎপাদনশীল ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে বাধ্য করবে। এটি পূর্বের বিতর্কিত বা দুর্বল স্কিমগুলোর মতো হবে না, বরং এখানে কঠোর করপোরেট জবাবদিহিতা ও স্পষ্ট অর্থনৈতিক ফলাফলের ওপর জোর দেওয়া হবে। এতে যুক্তরাজ্যের আর্থিক ব্যবস্থার অখণ্ডতা রক্ষা করেই উচ্চ-মূল্যের বিদেশী বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব।

সবশেষে বলা প্রয়োজন, চ্যান্সেলর এবং পেন্টাগনের মতো অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের ট্যাক্স এনভায়রনমেন্ট বা কর কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। মূলধনী লাভ (CGT), ব্যবসায়িক সম্পদ হস্তান্তর স্বস্তি, বা উত্তরাধিকার করের ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে এক ধরনের ‘কমপ্লেক্সিটি ট্যাক্স’ বা জটিলতার কর তৈরি করে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা হলো দীর্ঘমেয়াদী এবং স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ করা এবং আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া।

banner
Link copied!