সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

ঘাড়ের পেশি সুরক্ষা

ঘাড়ের পেশি শক্তিশালী করার ৫ সহজ ব্যায়াম জানালেন চিকিৎসক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : অক্টোবর ৫, ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম

ঘাড়ের পেশি শক্তিশালী করার ৫ সহজ ব্যায়াম জানালেন চিকিৎসক

আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর জীবনযাত্রায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনে ঝুঁকে কাজ করার ফলে মানুষের ঘাড়ের ওপর অস্বাভাবিক শারীরিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের আওতাধীন লন্ডনের কুইন্স হাসপাতালের মেরুদণ্ড বিশেষজ্ঞ ও নিউরোসার্জন অ্যান্টনি ঘোষ জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সোজা ভঙ্গিতে মানুষের মাথার ওজন ঘাড়ের ওপর মাত্র ১২ পাউন্ড বা প্রায় সাড়ে পাঁচ কেজির মতো চাপ ফেলে। কিন্তু যখনই মাথা নিচু করে স্ক্রিনের দিকে দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে থাকা হয়, তখনই সেই ভর বেড়ে প্রায় ৬০ পাউন্ড বা ২৭ দশমিক ২ কেজিতে রূপ নেয়। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সাময়িকী ও বিবিসির প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

অতিরিক্ত ঝুঁকে থাকার এই ভঙ্গি মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করছে।

চিকিৎসকদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের পেশিবহুল কাঠামোর নমনীয়তা কমে যাওয়া এবং টিস্যু শক্ত হয়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। চল্লিশোর্ধ্ব প্রায় প্রতিটি মানুষেরই মেরুদণ্ডের এমআরআই স্ক্যানে কশেরুকার মধ্যবর্তী ডিস্কের কিছু ক্ষয় ধরা পড়ে এবং ঘাড়ের পেছনের হাড়ের সংযোগস্থলগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা ভারী ও শক্ত হয়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মোবাইল ও কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে কাজ করার অভ্যাস। এই অভ্যাসের কারণে পিঠের ওপরের অংশ অস্বাভাবিক কুঁজো হয়ে থাকে এবং চিবুক কাঁধের চেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, যা ঘাড়ের পেশি ও উপরিভাগের মেরুদণ্ডের হাড়ে মারাত্মক টান সৃষ্টি করে।

বিশ্বজুড়ে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘাড়ের ব্যথায় ভোগেন এবং তাদের অর্ধেকের ক্ষেত্রে এটি নিয়মিত সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, মেরুদণ্ডের এই বিকৃতি এখন তরুণ ও শিশুদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং গত তিন দশকে অস্বাভাবিক মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাওয়ার সমস্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। চিকিৎসক অ্যান্টনি ঘোষ পরামর্শ দিয়েছেন যে ব্যয়বহুল চেয়ার কেনার চেয়ে নিজের শরীরকে সচল রাখা এবং নিয়মিত স্ক্রিন বিরতি নেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। মেরুদণ্ড মূলত নিয়মিত নড়াচড়া করতে পছন্দ করে, যা রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখে এবং পেশির শক্তি বাড়ায়।

ঘাড়ের সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়াতে চিকিৎসকেরা পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ব্যায়াম অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথম পদ্ধতিটি হলো সোজা হয়ে বসে বা শুয়ে মাথা যতটা সম্ভব ডানে ঘুরিয়ে দুই সেকেন্ড ধরে রাখা, যাতে বিপরীত পাশের পেশিতে হালকা টান অনুভূত হয়। এরপর মাথা শুরুর অবস্থানে এনে একইভাবে বাম পাশে ঘোরাতে হবে এবং দিনে কয়েকবার এই প্রক্রিয়া চালানো যায়। দ্বিতীয়ত, সারাদিন ঘাড়ের সঠিক ও স্বাভাবিক ভঙ্গি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যেখানে কাঁধ ও পিঠ শিথিল রেখে চিবুক সামনে না বাড়িয়ে ঘাড়কে সোজা মেরুদণ্ডের সমান্তরালে রাখতে হবে।

কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চিবুক অস্বাভাবিকভাবে সামনের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার সমস্যা দূর করতে তৃতীয় ব্যায়ামটি বেশ কার্যকর। এ ক্ষেত্রে ঘাড়কে আলতোভাবে ওপরের দিকে লম্বা করে চিবুক ভেতরের দিকে বুকের কাছে টানতে হয়, যেন চিবুকের নিচে একটি নরম পিচ ফল ধরে রাখা হয়েছে এবং তা যেন পড়ে না যায় বা অতিরিক্ত চাপে গলে না যায়। একই সময়ে কাঁধের হাড় পেছনের দিকে মেরুদণ্ডের সমান্তরালে টেনে পেটের নিচের পেশি শক্ত করে পিঠের স্বাভাবিক বাঁক বজায় রাখতে হয়।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় যে শিল্প বিপ্লবের আগের যুগে গবেষক ও লেখকেরা প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে হেলানো বিশেষ ডেস্কে পড়তেন ও লিখতেন, যা ঘাড়ে কোনো কৃত্রিম চাপ তৈরি করত না। সমতল ডেস্কে কালির কলমে লিখলে কালির দাগ লেগে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় সে সময় হেলানো ডেস্ক প্রচলিত ছিল, যা শরীরের কাঠামোর জন্যও অত্যন্ত উপকারী ছিল। তবে গত এক শতাব্দীতে টাইপরাইটার ও কম্পিউটারের ব্যবহারে ফ্ল্যাট বা সমতল টেবিলের প্রসার ঘটেছে এবং এর হাত ধরেই নতুন ধরনের শারীরিক অসুস্থতা প্রবেশ করেছে।

ঘাড়ের গভীর পেশিগুলোর শক্তি বাড়াতে চতুর্থ ব্যায়াম হিসেবে বিছানায় হাঁটু ভাঁজ করে চিৎ হয়ে শুয়ে চিবুক বুকের কাছে এনে মাথা মেঝে থেকে মাত্র এক ইঞ্চি ওপরে তুলে ধরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুরুতে এটি কয়েক সেকেন্ডের জন্য করা হলেও ধীরে ধীরে সময় বাড়িয়ে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত করা সম্ভব। পঞ্চম ব্যায়ামটিতে হেডরেস্ট থাকা একটি চেয়ারে বসে মাথা পেছনের দিকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখে চিবুক বুকের দিকে নামিয়ে আনতে হয়। আরও অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে ইলাস্টিক রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড কপালে পেঁচিয়ে সামনের দিকে শরীর টেনে ঘাড়ের ওঠানামা অনুশীলনের পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে যেকোনো নতুন ব্যায়াম শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

banner
Link copied!