আজ ৮ মে ২০২৬, প্রযুক্তির ইতিহাসে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লড়াইয়ে একটি বড় পিছু হটার দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মেটার মালিকানাধীন জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রাম তাদের মেসেজিং সিস্টেম থেকে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন বা ইটুইই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে বন্ধ করে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ডিরেক্ট মেসেজ বা ডিএম-এর সুরক্ষা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। মেটা, যারা এক সময় এই প্রযুক্তিকে ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে প্রচার করত, তাদের এই আকস্মিক ‘ইউ-টার্ন’ প্রযুক্তি বিশ্বে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন থেকে আপনার পাঠানো প্রতিটি ছবি, ভিডিও বা ভয়েস নোট মেটার সার্ভারে প্লেইন টেক্সট বা দৃশ্যমান অবস্থায় থাকবে, যা আগে অসম্ভব ছিল।
এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন হলো এমন একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা যেখানে কেবল প্রেরক এবং প্রাপকই কোনো বার্তা পড়তে পারেন। এমনকি যে কোম্পানি সার্ভিসটি দিচ্ছে, তাদের পক্ষেও সেই মেসেজের ভেতরে কী আছে তা জানা সম্ভব হয় না। ২০১৯ সালে মার্ক জাকারবার্গ ঘোষণা করেছিলেন যে ভবিষ্যতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হবে একান্তই ব্যক্তিগত। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপের পর ফেসবুক মেসেঞ্জার এবং ইনস্টাগ্রামেও এই প্রযুক্তি চালুর কাজ শুরু হয়েছিল। তবে সাত বছর পর এসে মেটা সেই পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়াল। আজ থেকে ইনস্টাগ্রামে কেবল ‘স্ট্যান্ডার্ড এনক্রিপশন’ থাকবে, যা মূলত জিমেইলের মতো সার্ভিসগুলোতে দেখা যায়। এর অর্থ হলো বিশেষ প্রয়োজনে বা আইনি চাপে মেটা এখন থেকে আপনার ইনবক্স খুলে দেখার ক্ষমতা রাখবে।
মেটার এই সিদ্ধান্তের পেছনে দুটি বিপরীতমুখী মতবাদ কাজ করছে। শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। এনএসপিসিসি-র মতো চ্যারিটিগুলো দীর্ঘকাল ধরে দাবি করে আসছিল যে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন অপরাধীদের লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে। তাদের মতে, এনক্রিপশন থাকলে পুলিশের পক্ষে গ্রুমিং বা শিশু নির্যাতনের প্রমাণ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। আজ থেকে ইনস্টাগ্রাম ডিএম মেটার নজরদারিতে আসায় তারা আশা করছেন যে অনলাইনে অপরাধীদের শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে এই যুক্তির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন নাগরিক অধিকার এবং সাইবার নিরাপত্তা কর্মীরা। তাদের মতে, সবার ব্যক্তিগত সুরক্ষা কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
বিগ ব্রাদার ওয়াচের মতো সংগঠনগুলো মেটার এই সিদ্ধান্তকে সরকারি চাপের কাছে নতি স্বীকার হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এর ফলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য এখন হ্যাকিং বা সরকারি নজরদারির শিকার হওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেল। বিশেষ করে যারা মানবাধিকার কর্মী বা সাংবাদিক, তাদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ডিএম এখন একটি অনিরাপদ মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করছেন যে মেটার এই পরিবর্তনের পেছনে অন্য একটি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ তথ্যের প্রয়োজন। ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত মেসেজ যদি এনক্রিপটেড না থাকে, তবে সেই তথ্য এআই মডেলের মানোন্নয়নে ব্যবহার করা মেটার জন্য অনেক সহজ হবে।
যদিও ইনস্টাগ্রাম দাবি করেছে যে তারা এআই প্রশিক্ষণে ডিএম ব্যবহার করে না, তবুও সাম্প্রতিক সময়ে মেটার নীতিমালায় নানা পরিবর্তন সেই সংশয় বাড়িয়ে দিয়েছে। গত মাসে মেটা তাদের কর্মীদের জানিয়েছিল যে তাদের কাজের ডিভাইসে করা প্রতিটি ক্লিক এবং অ্যাক্টিভিটি এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হবে। গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও এমন কিছুর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া টার্গেটেড বিজ্ঞাপনের ব্যবসায়িক প্রসারে ব্যবহারকারীদের রুচি ও কথোপকথন সম্পর্কে জানা মেটার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এনক্রিপশন সরে যাওয়ায় এই তথ্য সংগ্রহ এখন প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো বাধা হয়ে থাকবে না। মেটার পক্ষ থেকে অ্যাডাম মোসেরি এই বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, যা রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে।
সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এই পরিবর্তনের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। মেটা গত মার্চ মাসেই নিঃশব্দে অ্যাপের শর্তাবলী আপডেট করেছিল, যেখানে জানানো হয়েছিল যে ৮ মে ২০২৬ এর পর আর এনক্রিপশন সমর্থন করা হবে না। আজ থেকে অনেক ব্যবহারকারী তাদের ইনবক্সে একটি নোটিফিকেশন দেখতে পাচ্ছেন যেখানে তাদের পুরনো এনক্রিপটেড চ্যাটগুলোর মিডিয়া ফাইল ডাউনলোড করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কারণ এই পরিবর্তনের ফলে পুরনো অনেক সুরক্ষিত চ্যাট আর আগের মতো অ্যাক্সেস করা যাবে না। যারা এতদিন ইনস্টাগ্রামকে একটি নিরাপদ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম মনে করতেন, তাদের এখন থেকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কোনো সংবেদনশীল তথ্য বা ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করার আগে মনে রাখতে হবে যে আপনার ইনবক্সের চাবি এখন মেটার হাতেও রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ভিক্টোরিয়া বেইনস মনে করেন যে মেটা এখন আর ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। তার মতে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন ব্যবহারকারীর প্রতিটি যোগাযোগকে পণ্য হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। হোয়াটসঅ্যাপে এনক্রিপশন বজায় থাকলেও ইনস্টাগ্রাম থেকে এটি সরিয়ে নেওয়া নির্দেশ করে যে মেটা তাদের ইকোসিস্টেমকে ভিন্ন ভিন্ন স্তরে ভাগ করছে। একটি স্তর থাকবে যেখানে তথ্য সম্পূর্ণ সুরক্ষিত, আর অন্য একটি স্তর থাকবে যা কোম্পানির বাণিজ্যিক ও এআই স্বার্থে ব্যবহার করা হবে। এই বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারকারীদের আস্থার সংকটে ফেলতে পারে।
পরিশেষে যারা এখনও ইন্টারনেটে গোপনীয়তা বজায় রাখতে চান, তাদের জন্য সিগন্যাল বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপগুলোই এখন ভরসা। ইনস্টাগ্রামের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে বড় টেক জায়ান্টগুলোর প্রতিশ্রুতি সবসময় স্থায়ী হয় না। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল রাইটস বা ডিজিটাল অধিকারের সুরক্ষা এখন আমাদের নিজেদের সচেতনতার ওপর নির্ভর করছে। আপনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সুরক্ষিত রাখতে হলে এখন থেকে এনক্রিপটেড নয় এমন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ইনস্টাগ্রাম হয়তো এখন আগের চেয়ে বেশি ফিচারের প্রতিশ্রুতি দেবে, কিন্তু সেই ফিচারের বিনিময় মূল্য হিসেবে তারা আপনার জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত অংশটিকেই বেছে নিয়েছে।
