বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী চ্যাটজিপিটি এখন কেবল ই-মেইল লেখা বা তথ্য খোঁজার মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। একাকীত্ব দূর করতে বা মনের গোপন কথা খুলে বলতে অনেকেই এখন এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শরণাপন্ন হচ্ছেন। তবে ওপেনএআই-এর সাম্প্রতিক এক ঘোষণায় ব্যবহারকারীদের এই গোপন আড্ডার নিরাপদ জায়গাটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ‘ট্রাস্টেড কনট্যাক্ট’ নামে একটি নতুন ফিচার চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা মূলত ব্যবহারকারীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে। তবে এই ফিচারের কারণে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের একাংশ।
ওপেনএআই-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই নতুন ফিচারটি মূলত ‘ডিটেক্ট অ্যান্ড ভেরিফাই’ মডেলে কাজ করবে। যদি চ্যাটজিপিটির অভ্যন্তরীণ অ্যালগরিদম শনাক্ত করে যে কোনো ব্যবহারকারী তার কথোপকথনে আত্মহত্যা, আত্মক্ষতি বা তীব্র মানসিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন তবে সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্ক হয়ে উঠবে। এরপর প্রতিষ্ঠানের একটি মানব পর্যবেক্ষণ দল বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করবে। যদি ঝুঁকিটি গুরুতর বলে মনে হয় তবে ব্যবহারকারীর আগে থেকে নির্ধারিত ‘বিশ্বস্ত যোগাযোগব্যক্তি’ বা ট্রাস্টেড কনট্যাক্টের কাছে একটি জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হবে যাতে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এই উদ্যোগটি ডিজিটাল একাকীত্ব ঘোচাতে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মধ্যে এটি নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ভারতের ফর্টিস হেলথকেয়ারের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ড. সমীর পারিখের মতে একজন পেশাদার থেরাপিস্ট রোগীর পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেন কখন পরিবারের কাউকে যুক্ত করা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পক্ষে একজন মানুষের সূক্ষ্ম মানসিক পরিবর্তন বা সাময়িক হতাশার গভীরতা সঠিকভাবে বোঝা সবসময় সম্ভব নয়। অ্যালগরিদম হয়তো নির্দিষ্ট কিছু শব্দ শনাক্ত করতে পারবে কিন্তু সেই মুহূর্তের মানবিক আবেগ বোঝার ক্ষমতা এআই-এর এখনও তৈরি হয়নি বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।
গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে ওপেনএআই স্পষ্ট করেছে যে তারা কোনোভাবেই ব্যবহারকারীর সম্পূর্ণ চ্যাটের কপি বা ব্যক্তিগত কথোপকথন তৃতীয় কারো সাথে শেয়ার করবে না। কেবল ঝুঁকির মাত্রা বুঝে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সতর্ক করা হবে। তবে সমালোচকরা বলছেন এই ব্যবস্থার ফলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বাড়তে পারে। মানুষ যদি জানে যে তার প্রতিটি কথা নজরদারি করা হচ্ছে এবং তার ভিত্তিতে প্রিয়জনের কাছে বার্তা যেতে পারে তবে তারা হয়তো আর আগের মতো খোলামেলাভাবে কথা বলবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারকারীদের এআই-এর ওপর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে সফটওয়্যার মানুষের মানসিক অবস্থা তার কাছের মানুষের চেয়েও দ্রুত বুঝতে পারছে। তবে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতই আধুনিক হোক না কেন বাস্তব জীবনের মানবিক সহায়তার কোনো বিকল্প নেই। একটি চ্যাটবট হয়তো সংকট শনাক্ত করে একটি বার্তা পাঠাতে পারে কিন্তু মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষের হাত ধরে পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তার নেই। তাই এই ফিচারের উপযোগিতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটি যে এআই জগতের নীতিমালায় এক নতুন মোড় নিয়ে আসবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এই ফিচারটি পর্যায়ক্রমে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
