শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

গাড়ির বদলে পায়ে হেঁটে জঙ্গল ভ্রমণ: জাম্বিয়ার নতুন বিপ্লব

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৮, ২০২৬, ০৩:০১ পিএম

গাড়ির বদলে পায়ে হেঁটে জঙ্গল ভ্রমণ: জাম্বিয়ার নতুন বিপ্লব

আফ্রিকার গহীন অরণ্যে বন্যপ্রাণী দেখার চিরাচরিত ধারণা বদলে দিচ্ছে জাম্বিয়া। যেখানে কেনিয়ার মাসাই মারা কিংবা তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটিতে পর্যটকদের গাড়ির দীর্ঘ সারি বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে, সেখানে জাম্বিয়া বেছে নিয়েছে এক শান্ত ও গভীর অভিজ্ঞতা যার নাম ওয়াকিং সাফারি। বর্তমানে জাম্বিয়াকে বিশ্বের ওয়াকিং সাফারির রাজধানী বলা হচ্ছে। এখানে পর্যটকরা কোনো ধাতব গাড়ির বর্ম ছাড়াই সরাসরি প্রকৃতির মুখোমুখি হন। এই অভিজ্ঞতায় কেবল চোখ নয় বরং শ্রবণ, ঘ্রাণ এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটে। ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের কাছে মোসি-ও-তুনিয়া ন্যাশনাল পার্কে যখন একজন গাইড আপনাকে সারিবদ্ধভাবে বনের ভেতর দিয়ে নিয়ে যান, তখন প্রতিটি শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ এক আলাদা রোমাঞ্চ তৈরি করে।

জাম্বিয়ার এই বিশেষ পর্যটন ব্যবস্থার অন্যতম প্রাণপুরুষ হলেন টমাস মুলোঙ্গা। তিনি যখন পর্যটকদের নিয়ে মোবানে বনের মধ্য দিয়ে হাঁটেন, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ হয় অত্যন্ত সতর্ক। তার সাথে থাকে দুজন সশস্ত্র বন্যপ্রাণী স্কাউট যাদের কাঁধে ঝোলানো রাইফেল কেবল চরম বিপদের জন্য। তবে মুলোঙ্গা বিশ্বাস করেন জঙ্গলকে সম্মান করলে জঙ্গলও আপনাকে সম্মান করবে। পায়ে হেঁটে ঘোরার সময় পর্যটকরা ধীরগতিতে চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দহীন এই পরিবেশে আপনি শুনতে পাবেন বনের গভীরে কোনো বেবুনের ডাক কিংবা হাতির নিঃশ্বাসের শব্দ। এটি কেবল বন্যপ্রাণী দেখা নয় বরং নিজেকে সেই আদিম ভূখণ্ডের একটি অংশ হিসেবে অনুভব করা।

জাম্বিয়ার এই ওয়াকিং সাফারির একটি বড় সাফল্য হলো গন্ডার সংরক্ষণ। আটের দশকে চোরাচালান এবং দুর্বল নিরাপত্তার কারণে জাম্বিয়া থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ অঞ্চলের সাদা ও কালো গন্ডার। ১৯৮৯ সালে জাম্বিয়াকে সাদা গন্ডার শূন্য এবং ১৯৯৮ সালে কালো গন্ডার শূন্য দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় আজ সেই দৃশ্য বদলে গেছে। বর্তমানে জাম্বিয়ায় ৬০টি কালো এবং ৫৪টি সাদা গন্ডার রয়েছে। এই গন্ডারগুলোকে খুঁজে বের করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হয় তার একটি বড় অংশ আসে এই ওয়াকিং সাফারি থেকে। পর্যটকরা যখন তাদের দেখার জন্য জঙ্গলে হাঁটেন, তখন তাদের দেওয়া অর্থ সরাসরি গন্ডারদের পাহারায় নিয়োজিত অ্যান্টি-পোচিং স্কোয়াডের পেছনে ব্যয় হয়।

ওয়াকিং সাফারিতে লুই টু-র মতো বিশালকার সাদা গন্ডারের মুখোমুখি হওয়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা। যখন আপনি কোনো বাধা ছাড়াই মাত্র কয়েক গজ দূরে একটি বিশাল প্রাণীকে বিশ্রাম নিতে দেখবেন, তখন বুঝতে পারবেন প্রকৃতির শক্তি কতটা অপার্থিব। এই পদ্ধতিতে পর্যটন পরিবেশের ওপর খুব কম চাপ সৃষ্টি করে। যেখানে সাফারির গাড়িগুলো মাটি পিষে ফেলে এবং ধোঁয়া ছড়ায়, সেখানে ওয়াকিং সাফারি কোনো চিহ্ন না রেখেই জঙ্গল ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়। এটি একটি টেকসই পর্যটন মডেল যা সারা বিশ্বের পরিবেশবাদীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

জাম্বিয়ার এই মডেলে সময়ের গতি ধীর হয়ে যায়। এখানে এক sighting থেকে অন্য sighting-এ যাওয়ার কোনো তাড়া নেই। পর্যটকরা মাটির ধুলোয় গন্ডারের পায়ের ছাপ দেখে বুঝতে শেখেন সেটি কতটা তাজা। বনের ছোট ছোট কীটপতঙ্গ কিংবা ভেষজ উদ্ভিদের গুরুত্ব তখন চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি মূলত ‘স্লো ট্যুরিজম’ বা ধীর গতির পর্যটনের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পর্যটকরা যখন বনের ভেতরে হেঁটে চলেন, তারা বুঝতে পারেন বন্য মহিষ কিংবা জলহস্তীর মতো আগ্রাসী প্রাণীদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা কতটা জরুরি। এখানে প্রতিটি মুহূর্ত এক জীবনমুখী শিক্ষা।

জাম্বিয়ার পর্যটন বোর্ড এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকারীরা এখন উচ্চমানের কিন্তু কম প্রভাব সৃষ্টিকারী পর্যটনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য হলো পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ানো নয় বরং গুণগত মান বাড়ানো। ওয়াকিং সাফারি সেই লক্ষ্য পূরণে প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এতে যেমন বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে তেমনি স্থানীয়দের কর্মসংস্থানও বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশের জন্য জাম্বিয়ার এই মডেলটি একটি আদর্শ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটন যে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে, জাম্বিয়া তা সফলভাবে প্রমাণ করেছে।

আগামী দিনগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই ধরনের পরিবেশবান্ধব পর্যটন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জাম্বিয়া তাদের এই ঐতিহ্যের মাধ্যমে বিশ্বকে দেখাচ্ছে কীভাবে আধুনিক পর্যটন এবং আদিম অরণ্যের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করা যায়। আপনি যদি বন্যপ্রাণীকে কোনো কাঁচের আড়াল ছাড়াই অনুভব করতে চান এবং বনের প্রকৃত নীরবতা শুনতে চান, তবে জাম্বিয়ার এই ওয়াকিং সাফারি আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকতে পারে।

banner
Link copied!