গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ স্টিল রাষ্ট্রীয়করণ করার পর সাবেক মালিক চীনা প্রতিষ্ঠান জিংয়ে গ্রুপ বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে বলে আল জাজিরা এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। এই অভাবনীয় পদক্ষেপের জেরে লন্ডন ও বেইজিংয়ের মধ্যে এক নতুন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জিংয়ে স্টিল গত রোববার এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নিয়মাবলি পদদলিত করা বন্ধ করে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সমস্ত বিনিয়োগ ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সরকার গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ স্টিলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। এর আগে গত বছর জিংয়ে গ্রুপ উত্তর ইংল্যান্ডের স্কানথর্প কারখানায় অবস্থিত ব্লাস্ট ফার্নেসগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কথা বিবেচনা করছিল বলে জানা যায়। এই বিশাল কারখানাটি সমগ্র যুক্তরাজ্যে সরাসরি আকরিক থেকে কাঁচা ইস্পাত তৈরির সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান।
যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য ও ব্যবসা বিভাগ জানিয়েছে, হাজার হাজার চাকরি বাঁচানো এবং প্রতিরক্ষা ও বড় নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে দেশীয় ইস্পাতের সরবরাহ নিশ্চিত করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতেই কারখানাটি রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছে। দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী পিটার কাইল এক বিবৃতিতে বলেন, ব্রিটিশ স্টিল এখন ব্রিটিশ জনগণের সম্পদ এবং সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো ব্যবসাটি স্থিতিশীল করে একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক ইস্পাত খাত গড়ে তোলা।
তবে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাজ্য জিংয়ের অবদানকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠানটি দখল করেছে। বেইজিং জানিয়েছে, এই ঘটনা যুক্তরাজ্যে চীনা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ১৯৮৬ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় যুক্তরাজ্যকে অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।
ব্রিটিশ স্টিলের স্কানথর্প কারখানায় বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কর্মী কাজ করেন এবং এটি বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন ইস্পাত উৎপাদন করে। জিংয়ে গ্রুপ ২০২০ সালে এই কারখানাটি কিনে নিয়েছিল এবং এর কার্যক্রম সচল রাখতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। আর্থিক লোকসান অব্যাহত থাকায় কারখানাটির কার্যক্রম চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সংসদে জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশ স্টিল তাদের জাতির অন্যতম ভিত্তি এবং শিল্পশক্তির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সরকার মনে করে, যদি এই কারখানাটি বন্ধ হয়ে যেত, তবে দেশটিকে রেলওয়ে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক উপকরণের ক্ষেত্রে পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে হতো। জিংয়ে গ্রুপের দাবি, সরকার এই কারখানার জন্য তাদের বিশাল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় শূন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তাদের দাবি, ২০২৮ সাল নাগাদ এই কারখানার পেছনে যুক্তরাজ্যের করদাতাদের খরচের পরিমাণ ১৫০ কোটি পাউন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যকার এই গভীর বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এল যখন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। তার মেয়াদের শুরুতেই অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার চীনের সাথে এমন একটি গুরুতর মুখোমুখি অবস্থানে পড়তে হলো। যা কম স্পষ্ট তা হলো, আসন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে নতুন ব্রিটিশ নেতৃত্ব কীভাবে চীনের এই বিপুল ক্ষতিপূরণের দাবি এবং বাণিজ্যিক চাপ সামলাবে।
