আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এবং রহস্যময় ঘটনা হলো দেশটির প্রথম নারী ইভা পেরনের মৃতদেহ নিখোঁজ হওয়া। ১৯৫২ সালের ২৬ জুলাই মাত্র ৩৩ বছর বয়সে সার্ভিকাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন ইভা পেরন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরনের স্ত্রী হিসেবে তিনি শ্রমিক শ্রেণির কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট পেরন চেয়েছিলেন স্ত্রীর মৃতদেহ সংরক্ষণ করতে। এই কাজে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রখ্যাত স্প্যানিশ অ্যানাটমিস্ট পেড্রো আরাকে। রাশিয়ার লেনিন ও স্তালিনের মৃতদেহ যেভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল, একই পদ্ধতিতে তিনি ইভার দেহ এমবামিং করেন।
মৃতদেহটি শ্রম মন্ত্রণালয়ের ভবনে একটি কাঁচের কফিনে রাখা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল সেখানে শ্রমিকদের সম্মানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। কিন্তু ১৯৫৫ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে হুয়ান পেরনের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। নতুন সামরিক শাসকরা ইভা পেরনের মরদেহকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ভয় পেতে শুরু করে। পেরোনিজমের প্রভাব পুরোপুরি মুছে ফেলতে তারা ইভার মৃতদেহ চুরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। শুরু হয় এক দীর্ঘ ও লোমহর্ষক ১৬ বছরের যাত্রা।
সেনা গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান কার্লোস মুরিকো কোয়েইনিগের ওপর দায়িত্ব পড়ে মৃতদেহটি সরিয়ে ফেলার। তিনি বুয়েনস আইরেসের বিভিন্ন স্থানে এটি লুকিয়ে রেখেছিলেন। কখনও ভ্যানে, কখনও সিনেমার পর্দার পেছনে, আবার কখনও শহরের জল সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে মরদেহটি স্থানান্তর করা হয়েছিল। যেখানেই মরদেহ রাখা হতো, সেখানেই পেরন ভক্তরা মোমবাতি ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতেন। কোয়েইনিগ পরবর্তীতে মরদেহটি তার নিজের অফিসে নিয়ে আসেন এবং দর্শকদের সামনে সেটি প্রদর্শন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার এই আচরণ দেখে মনে হতো তিনি মরদেহটির প্রতি মানসিকভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন।
১৯৫৭ সালে সামরিক সরকার এই মরদেহটি আর্জেন্টিনার বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ইভা পেরনের মৃতদেহটি মারিয়া মাগজি ডি ম্যাজিস্ট্রিস নামে ইতালির মিলানের একটি কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। কিন্তু আর্জেন্টিনায় ভক্তরা তখনও বিশ্বাস করতেন যে তাদের নেত্রী জীবিত আছেন অথবা কোথাও ফিরবেন। দেশজুড়ে দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতো ইভা পেরনের মৃতদেহ কোথায় আছে। এটি পেরনবাদীদের জন্য একটি বড় আন্দোলনের ইস্যুতে পরিণত হয়।
১৯৭১ সালে আর্জেন্টিনায় নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি বদলায়। সামরিক সরকার অবশেষে ইভার মৃতদেহ হুয়ান পেরনের কাছে ফেরত দিতে সম্মত হয়। মাদ্রিদে নির্বাসিত জীবনে থাকা হুয়ান পেরনের কাছে রূপার কফিনে মরদেহটি ফেরত পাঠানো হয়। তৎকালীন প্রতিবেদনে জানা যায়, তার তৃতীয় স্ত্রী ইসাবেল পেরন পরম যত্নে দীর্ঘ সময় পর মরদেহটি পরিষ্কার করেন এবং চুল আঁচড়ে দেন। ১৯৭৪ সালে হুয়ান পেরনের মৃত্যুর পর অবশেষে ইভা পেরনের মরদেহটি আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে একটি শক্তিশালী ক্রিপ্টে সমাহিত করা হয়। ইভা পেরনের এই দীর্ঘ ও বিতর্কিত যাত্রা ইতিহাসের পাতায় আজও এক বিষাদময় অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
