শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

পশ্চিম তীরে ক্ষুধা

জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা বন্ধের পর তীব্র সংকটে ফিলিস্তিনিরা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০১:৩০ পিএম

জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা বন্ধের পর তীব্র সংকটে ফিলিস্তিনিরা

জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দখলকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা তীব্র ক্ষুধা ও অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। আন্তর্জাতিক তহবিলের সংকটের কারণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপি এই অঞ্চলের খাদ্য সহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা অর্ধেকের মতো কমিয়ে দিয়েছে।

ফওজা আওয়াদ নামের পঁচাত্তর বছর বয়সী এক বিধবা নারী উত্তর পশ্চিম তীরের শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় তার বাসস্থান হারিয়েছিলেন। তিনি বর্তমানে তুলকারেমের একটি ছোট এবং অসমাপ্ত বাড়িতে তার ছেলে, ছেলের স্ত্রী ও তাদের সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন। এই পরিবারটি আগে জাতিসংঘের সংস্থাটি থেকে সীমিত সহায়তা পেলেও গত পাঁচ মাস ধরে কোনো ধরনের সাহায্য পায়নি। ফওজা জানিয়েছেন যে তার আগের বাড়িটি সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে সামরিক যানবাহনের জন্য রাস্তা তৈরি করেছে।

তিনি অ্যাজমা ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসুস্থতায় ভুগছেন এবং তার প্রতি মাসে অন্তত ২০০ শেকেল মূল্যের ওষুধের প্রয়োজন হয় যা কেনার সামর্থ্য তার নেই। তার এক ছেলেকে ২০২৪ সাল থেকে আটক করে রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। অন্যদিকে ইসরায়েলের ভেতরে কাজের অনুমতিপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ায় তার অন্য ছেলেরাও চাকরি হারিয়েছেন।

কাছাকাছি তুলকারেমের থানাবে এলাকার আল মোওয়াহহাদ স্কুলের ভবনে ছোট ছোট কক্ষে এক হাজারের বেশি বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি আশ্রয় নিয়ে আছেন। রবাব কাসেম, তার স্বামী তালেব আবু সার্রিয়া ও তাদের তিন সন্তান কোনো ধরনের আয় ছাড়াই গত দুই বছর ধরে ৩০ বর্গমিটার আয়তনের একটি নিচতলার কক্ষে বসবাস করছেন। গত তিন মাস ধরে তাদের খাদ্য সহায়তাও বন্ধ রয়েছে।

তালেব জানিয়েছেন যে তার পরিবার প্রায়ই রুটি বা উপযুক্ত খাবার ছাড়াই ক্ষুধার্ত পেটে ঘুমাতে যায়। এই সংঘাত শুরু হওয়ার আগে তিনি তুলকারেম শরণার্থী শিবিরে সবজির একটি ছোট দোকান চালাতেন। রবাব ডিস্কের সমস্যায় ভুগছেন এবং তার প্রতি মাসে ৩০০ শেকেল মূল্যের চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও সেই খরচ মেটানোর কোনো উপায় তার নেই।

আন্তর্জাতিক দাতাদের পক্ষ থেকে তহবিলের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় এই সহায়তা কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলের মানুষের খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে এবং বর্তমানে পশ্চিম তীরের প্রায় ৯ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর ৭৬ শতাংশের আয় কমে গেছে এবং ১২ শতাংশ পরিবার অত্যন্ত নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

হেব্রোনের দক্ষিণে অবস্থিত মুসাফের ইয়াত্তার বাসিন্দা সাঈদ আল আমৌর ও তার চৌদ্দ সদস্যের পরিবার গত সাত মাস ধরে কোনো সাহায্য পায়নি। গত বছরের এপ্রিল মাসে তার গ্রামে এক হামলার সময় এক বসতিস্থাপনকারীর গুলিতে তিনি আহত হন এবং তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। তার প্রতি মাসে অন্তত ১ হাজার ২০০ শেকেল মূল্যের চিকিৎসা প্রয়োজন এবং কিছু জলপাই গাছ ছাড়া তার আর কোনো আয়ের উৎস নেই, যে গাছগুলো দখল করার জন্য বসতিস্থাপনকারীরা প্রায়ই চেষ্টা চালায়।

অর্থনীতিবিদ উবাই আবৌদি জানিয়েছেন যে জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা বন্ধ হওয়া এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আর্থিক পতনের কারণে এই অঞ্চলটি এক গভীর মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের মে মাস থেকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পক্ষে সংগৃহীত শুল্কের অর্থ আটকে রেখেছে ইসরায়েল, যার ফলে সরকারি খাতের কর্মীদের বেতন প্রদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হাজার হাজার শ্রমিক তাদের চাকরি হারিয়েছেন এবং ৩৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

banner
Link copied!