আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব এবার বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার সংবাদে শুক্রবার লেনদেনের শুরু থেকেই তেলের দামে ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ১০৫ দশমিক ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার পরিস্থিতি প্রতিফলিতকারী ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ফিউচার শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬ দশমিক ১৭ ডলারে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর জানিয়েছেন যে ইসরায়েল ও লেবানন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্পের মতে এই কূটনৈতিক অগ্রগতি পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি স্থলসীমানায় কার্যকর হলেও সমুদ্রপথে এর প্রভাব এখনো বিপরীত। বিশ্লেষকরা বলছেন যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি বড় কোনো সংঘাত না থাকলেও উভয়েই একে অপরের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে নৌ অবরোধের পথ বেছে নিয়েছে। যার সরাসরি শিকার হয়েছে হরমুজ প্রণালী।
বর্তমান এই সংকটকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা আইইএ-এর প্রধান ফাতিহ বিরল। তার মতে প্রতিদিন প্রায় ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক গভীর গহ্বরের দিকে এগুচ্ছে। বিরল সতর্ক করেছেন যে পণ্যের এই ঘাটতি শুধু দাম বাড়াবে না বরং বড় ধরনের সরবরাহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। পরিস্থিতির জটিলতা বোঝাতে তিনি উল্লেখ করেন যে একযোগে এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজার থেকে উধাও হয়ে যাওয়া এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই অবস্থা যদি আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয় তবে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন ডলারের মান এই উত্তেজনার সুযোগে আরও শক্তিশালী হতে পারে যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাড়তি বিপদ ডেকে আনবে। বর্তমানে পরিস্থিতির যে চিত্র দাঁড়িয়েছে তাতে স্পষ্ট যে সামরিক লড়াইয়ের চেয়ে এখন অর্থনৈতিক লড়াই বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন রাষ্ট্রকে পরামর্শ দিচ্ছেন তারা যেন দ্রুত বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে মনোযোগ দেয়। কারণ হরমুজ প্রণালী যদি দীর্ঘ মেয়াদে অবরুদ্ধ থাকে তবে বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদন এবং পরিবহন ব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বর্তমান এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ এখন কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি এখন গভীর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।
