রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

বিশ্বজয়ের পথে আন্তা: এক চীনা উদ্যোক্তার অভাবনীয় সাফল্যের গল্প

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ১০:৪০ এএম

বিশ্বজয়ের পথে আন্তা: এক চীনা উদ্যোক্তার অভাবনীয় সাফল্যের গল্প

নাইকি-অ্যাডিডাসের দিন কি শেষ? ছবি : সংগৃহীত

বিশ্ব ক্রীড়া সামগ্রীর বাজারে নাইকি এবং অ্যাডিডাসের একচেটিয়া আধিপত্য দীর্ঘদিনের। তবে এই দুই মহীরুহকে এখন সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চীনের একটি ব্র্যান্ড যার নাম আন্তা স্পোর্টস। তিন দশক আগে একটি ছোট কারখানা থেকে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি এখন বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান পোক্ত করতে শুরু করেছে।

 লস অ্যাঞ্জেলেসের বেভারলি হিলসে নিজেদের ফ্ল্যাগশিপ স্টোর খোলার মাধ্যমে তারা জানান দিয়েছে যে তাদের লক্ষ্য এখন কেবল চীন নয় বরং পুরো বিশ্ব। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ভিড়ে আন্তার এই নাটকীয় উত্থান বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আন্তার এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে ডিং শিজং নামক একজন উদ্যোক্তার দৃঢ় সংকল্প। আশির দশকের শেষের দিকে যখন চীনের অর্থনীতি সবেমাত্র উন্মুক্ত হতে শুরু করেছিল তখন শিজং মাত্র ৬০০ জোড়া জুতো নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। হাই স্কুল ড্রপআউট এই তরুণ এক আত্মীয়র কারখানায় তৈরি সেই জুতো বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়েই তার প্রথম কর্মশালা স্থাপন করেন। 

২০০৫ সালে শিজং ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি চীনের নাইকি হতে চান না বরং বিশ্বের আন্তা হতে চান। তার সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে কারণ আন্তা এখন আর্কটেরিক্স এবং সলোমনের মতো নামী আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মালিক। এমনকি সম্প্রতি তারা জার্মানির বিখ্যাত ব্র্যান্ড পুমা-র একটি বড় অংশীদারিত্ব কিনে নিয়েছে।

চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের জিনজিয়াং শহরকে বলা হয় বিশ্বের জুতোর রাজধানী। এখানেই আন্তার জন্ম। এক সময় এই শহরটি ছিল কেবল পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য সস্তায় জুতো তৈরির একটি সাধারণ কেন্দ্র। হাজার হাজার ছোট বড় কারখানা মিলে এখানে এমন এক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যা বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না।

 ফুজিয়ান প্রদেশ এক সময় বিশ্বের মোট জুতোর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ উৎপাদন করত। দশকের পর দশক ধরে নাইকি বা অ্যাডিডাসের মতো প্রতিষ্ঠানের সাব-কন্টাক্টর হিসেবে কাজ করতে করতে চীনা কোম্পানিগুলো জুতো তৈরির কারিগরি বিদ্যা এবং মানদণ্ড আয়ত্ত করে ফেলে। তারা কেবল উৎপাদন করতেই শেখেনি বরং দ্রুততম সময়ে উন্নত পণ্য ডিজাইন করে বাজারজাত করার কৌশলও রপ্ত করেছে।

আন্তা ২০০৭ সালে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় এবং সে সময় তারা রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে তারা বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি দোকান পরিচালনা করছে এবং আইলিন গু-র মতো বিশ্ববিখ্যাত অ্যাথলেটদের নিজেদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন যে আন্তার এই বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এমন এক সময়ে সামনে আসছে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতারা শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ফ্যাক্টরিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে চীনা কোম্পানিগুলোর এই শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক সাপ্লাই চেইন মোকাবিলা করা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য সহজ হবে না।

আন্তার এই বিবর্তন চীনের সামগ্রিক শিল্প খাতের একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটায়। এক সময় তারা ছিল কেবল অন্যের কাজ করে দেওয়া কারখানার মজুর কিন্তু এখন তারা নিজেই এক একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড। শাওমি বা অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মতো আন্তাও প্রমাণ করেছে যে সাব-কন্টাক্টর থেকে বিশ্বমানের ব্র্যান্ড হওয়া সম্ভব। 

ব্রান্ডিং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে আন্তার নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন কেন্দ্র থাকায় তারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক দ্রুত নতুন ডিজাইন বাজারে আনতে পারে। নাইকি বা অ্যাডিডাসকে হটিয়ে আন্তা বিশ্বের এক নম্বর ব্র্যান্ড হতে পারবে কি না তা সময়ই বলে দেবে তবে তারা যে এখন বিশ্ববাজারের অন্যতম শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

banner
Link copied!