চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাবে চলতি বছর বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। গত অক্টোবর মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়। তবে সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করলে ২০২৭ সালে পণ্যমূল্য ৭ শতাংশ এবং ২০২৮ সালে ৮.৮ শতাংশ কমবে।
চলতি বছর জ্বালানি তেলের দাম ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা ২০২৭ সালে ১১.৫ শতাংশ কমে আসবে। বিশ্বব্যাংকের গত এপ্রিল মাসের পূর্বাভাসের তুলনায় চলতি বছরের জন্য জ্বালানি পণ্যের দাম ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জন্য ১৪ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে।
চলতি বছর বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ দৈনিক ৫০.৫ লাখ ব্যারেল বা ৫.২ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ সালের মহামারির মন্দা বাদ দিলে গত চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় পতনের ঘটনা। ২০২৬ সালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল গড়ে ৯১ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা গত ২০২৫ সালে ছিল ৬৯ ডলার। এরপর ২০২৭ সালে দাম কমে প্রতি ব্যারেল ৭৯ ডলার এবং ২০২৮ সালে ৭০ ডলারে নেমে আসবে।
মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহে ঘাটতির কারণে চলতি বছর বৈশ্বিক তেল ব্যবহার ২.৫ শতাংশ বা প্রতিদিন ২৬ লাখ ব্যারেল কমে যেতে পারে। ২০২০ ও ১৯৮০ সালের পর রেকর্ড অনুযায়ী এটি তৃতীয় বৃহত্তম বার্ষিক পতন।
চলতি বছর ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৫৮.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট ১৯ ডলারে দাঁড়াতে পারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এই দরবৃদ্ধি ঘটবে। তবে ২০২৭ সালে দাম ৭.৯ শতাংশ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খাদ্যপণ্যের বাজারদর চলতি বছর ১০.৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ৭.২ শতাংশ বাড়ার পথে রয়েছে। জ্বালানির চড়া খরচ, কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলে হামলা এবং শক্তিশালী এল নিনো আবহাওয়া এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ। বিশ্বজুড়ে গমের উৎপাদন ৩ শতাংশ কমে যাওয়ায় শুধু গমের দামই ২৮ শতাংশ বাড়বে, যার টানে চলতি বছর খাদ্যশস্যের দাম ১৪.৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৯.৩ শতাংশ বাড়বে।
কফি ও কোকোর উৎপাদন ঘুরে দাঁড়ানোর কারণে চলতি বছর পানীয়জাত পণ্যের দাম ২৩.৯ শতাংশ কমতে পারে। সারের দাম চলতি বছর ১৪.৩ শতাংশ বাড়লেও ২০২৭ সালে তা ১২.৪ শতাংশ কমে যাবে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ডেটা সেন্টারের জোরালো চাহিদা এবং সরবরাহের সংকটে ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাংকের ধাতু ও খনিজ মূল্য সূচক সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছাবে, যা ২৪.৫ শতাংশ বেশি।
গত এপ্রিল মাস থেকেই অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। চলতি বছর তামার গড় দাম প্রতি মেট্রিক টন ১৩,২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩২.৭ শতাংশ বেশি। তবে ২০২৭ সালে এই দাম ১.৫ শতাংশ কমতে পারে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে চাহিদার কারণে চলতি বছর মূল্যবান ধাতুর দাম ৩৯.৯ শতাংশ লাফিয়ে বাড়বে। তবে উন্নত দেশগুলোতে সুদের হার চড়া থাকায় ২০২৭ সালে এই দাম ৮.৩ শতাংশ কমতে পারে।
চলতি বছর সোনার গড় দাম প্রতি ট্রয় আউন্স রেকর্ড ৪,৬০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৩.৬ শতাংশ বেশি। পরবর্তীতে ২০২৭ সালে তা কমে ৪,২৫০ ডলারে নামবে। এছাড়া চলতি বছর রূপার দাম ৭৫.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৭০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের অবনতি, রাশিয়ার তেল সরবরাহে দীর্ঘমেত্রী বিঘ্ন এবং এল নিনোর কারণে ফসলের মারাত্মক ক্ষতির মতো আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল গড়ে ১০৫ ডলারে উঠতে পারে। এমনকি খাদ্যপণ্যের দাম নির্ধারিত পূর্বাভাসকেও ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে আরও জটিল করে তুলবে।
সংঘাতের অর্থনৈতিক ধাক্কা ও আর্থিক চাপ সামাল দিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কোটি ডলার সহায়তার ব্যবস্থা করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। এর মধ্যে ২৫টি দেশকে ইতিমধ্যেই ৮৭ কোটি ডলার বিতরণ করা হয়েছে।
