রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

বিশ্ব অর্থনীতিতে অচলাবস্থা: হরমুজ প্রণালী খোলার পর কত সময় লাগবে আস্থা ফিরতে?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম

বিশ্ব অর্থনীতিতে অচলাবস্থা: হরমুজ প্রণালী খোলার পর কত সময় লাগবে আস্থা ফিরতে?

ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৯ সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছে। আজ ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুকেন্দ্র হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। 

গত ফেব্রুয়ারি মাসে তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর থেকে এই অঞ্চলটি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। 

বর্তমানে খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি তেহরানের ক্ষমতায় আসীন। এই যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে যে, এটি ইতিহাসের বৃহত্তম তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা, যা ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রায় ২ হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এই জাহাজগুলো পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও মূল বাধা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং প্রযুক্তিগত এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত। 

মার্কিন পেন্টাগন জানিয়েছে যে, ইরানের পক্ষ থেকে এই জলপথে মাইন বা মাইন পেতে রাখা হয়েছে বলে তারা ধারণা করছে। গত ২১ এপ্রিল মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র পরিষেবা কমিটিকে পেন্টাগন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, পুরো প্রণালীটি মাইনমুক্ত করতে কমপক্ষে ছয় মাস সময় লাগবে। এই দীর্ঘ সময়সীমা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষত তৈরি করতে পারে। 

এর আগে ১১ এপ্রিল থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার—ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই পিটারসন এবং ইউএসএস মাইকেল মারফি মাইন অপসারণের কাজ শুরু করেছে। পরবর্তীতে এই অভিযানে পানির নিচে কাজ করতে সক্ষম ড্রোনও যুক্ত করা হয়েছে।

তবে কেবল মাইন অপসারণ করলেই জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে না। এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামুদ্রিক বিমা বা মেরিটাইম ইন্স্যুরেন্স। গত মার্চ মাসে বীমাকারীরা এই পথ দিয়ে চলাচলকারী ট্যাঙ্কারগুলোর ‘ওয়ার রিস্ক’ বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমা বাতিল করে দিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক বীমা সংস্থাগুলো আল জাজিরাকে জানিয়েছে যে, বর্তমানে এই পথ দিয়ে কোনো জাহাজ পাঠাতে চাইলে বীমা প্রিমিয়ামের হার জাহাজের মূল্যের ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যুদ্ধের আগে এই হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ একটি বিশাল ট্যাঙ্কারের জন্য বীমা খরচই এখন আকাশচুম্বী। বীমাকারীদের মতে, নৌবাহিনী মাইন পরিষ্কার করার দাবি করার পরও তারা কয়েক মাস পর্যবেক্ষণ করবেন যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে কি না। 

আস্থা ফিরে পেতে কেবল মাইন অপসারণ যথেষ্ট নয়, বরং এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমা প্রয়োজন।প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন।

 তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালীতে মাইন পাতার চেষ্টা করছে এমন কোনো ইরানি ছোট নৌকা দেখামাত্র যেন গুলি করে ধ্বংস করা হয়। তিনি এই মাইন অপসারণ কার্যক্রমকে তিন গুণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হলেও কোনো সমাধান আসেনি। 

এরপরই ট্রাম্প ইরানের বন্দর এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধের ঘোষণা দেন। এই অবরোধের ফলে ইরান এখন তাদের নিজস্ব রপ্তানি পণ্যও পাঠাতে পারছে না। এর আগে তেহরান ভারত, তুরস্ক বা চীনের মতো ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ দেশগুলোর জাহাজকে টোল বা মাশুলের বিনিময়ে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছিল, কিন্তু এখন তারা সব বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজের জন্য পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

ইরান সম্প্রতি একটি মানচিত্র প্রকাশ করে দেখিয়েছে যে তারা প্রণালীর কোন কোন অংশে মাইন পেতেছে। তারা একটি বিকল্প রুটও প্রস্তাব করেছে যা ওমানের চেয়ে ইরানের উপকূলের বেশি কাছাকাছি। তেহরানের দাবি, এটি ট্যাঙ্কারগুলোকে মাইনের বিপদ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। তবে ওয়াশিংটন এই দাবিকে নাকচ করে দিয়ে এটিকে ‘নৌ-দস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। 

গত ২৪ এপ্রিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ‘এপামিনন্ডাস’ নামক একটি জাহাজ জব্দ করে, যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতা না হচ্ছে এবং নৌবাহিনীগুলো শতভাগ নিশ্চয়তা না দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক শিপিংয়ের জন্য উন্মুক্ত হওয়া কঠিন। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে ৬ মাসের এই মাইন অপসারণ কার্যক্রমের দিকে, যার ওপর নির্ভর করছে আগামীর বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য।

banner
Link copied!