মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের উত্তাপ এখন সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে লন্ডনের রাজপথে আছড়ে পড়ছে। ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জেরে যুক্তরাজ্য বর্তমানে এমন এক ত্রিমুখী চাপের মুখে পড়েছে যা দেশটির অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সামরিক কৌশলকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলোর সাম্প্রতিক শিরোনামগুলো বিশ্লেষণ করলে এই অস্থিরতার স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ ও কিয়ার স্টারমারের অনড় অবস্থান লন্ডনের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাজ্য বর্তমানে একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটিশ ভোক্তাদের আস্থা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। দ্য গার্ডিয়ান সতর্ক করেছে যে ইরান যুদ্ধের কারণে পণ্যমূল্যের যে উল্লম্ফন শুরু হয়েছে, তার প্রভাবে দেশজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এর কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাজ্য একটি বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। ফলে হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্রিটিশ পেট্রোল পাম্পগুলোতে। ফাণ্ড ম্যানেজার অ্যাবারডিনের ডেপুটি চিফ ইকোনমিস্ট লুক বার্থোলোমিউ মনে করেন, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দুর্বল শ্রমবাজারের কারণে ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাজ্য বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একটি ইরান সংকট কমিটি গঠন করেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি এই কঠিন সময়ে কর্মজীবী মানুষের পাশে থাকবেন। তবে তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের অবকাঠামোতে হামলার জন্য যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি চাইলেও স্টারমার তাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট বলছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ট্রাম্পের রোষানলে পড়ার ঝুঁকি থাকলেও স্টারমার আপাতত ব্রিটিশ স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। তবে ব্রিটিশ বিমান বাহিনী বা আরএএফ-এর টাইফুন যুদ্ধবিমানগুলো হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখার মিশনে প্রস্তুত রাখা হয়েছে যা সামরিক উত্তজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ নেই, তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসেও পরিবর্তন আনছে। অনেক ব্রিটিশ নাগরিক ইতোমধ্যে তাদের বার্ষিক ছুটির পরিকল্পনা বাতিল করছেন এবং সুপারমার্কেটে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হচ্ছেন। সরকার আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিলেও দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে অনিয়মিত দীর্ঘ সারি এবং প্যানিক শপিং বা আতঙ্কিত কেনাকাটার চিত্র দেখা যাচ্ছে।
দ্য টাইমসের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, একজন সরকারি মন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে ইরান যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক প্রভাব অন্তত আগামী আট মাস স্থায়ী হতে পারে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর জ্বালানি সংকটের যে ধাক্কা ব্রিটিশরা সামলে ওঠার চেষ্টা করছিল, ইরানের এই যুদ্ধ সেই ক্ষতকে আরও গভীর করে তুলেছে।
মানবিক দিক থেকে যুক্তরাজ্যের বিশাল ইরানি ডায়াসপোরা বা প্রবাসী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। লন্ডনে বসবাসরত ওমিদ হাবিবিনিয়া আল জাজিরাকে জানান, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ইরানের সাথে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। ইরানে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং অবকাঠামোতে হামলার ফলে লাখ লাখ মানুষ তাদের আত্মীয়-স্বজনের খবর পাচ্ছেন না।
এই মানবিক বিপর্যয় লন্ডনের রাজপথেও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশনের ব্যানারে গত সপ্তাহে লন্ডনে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে হাজার হাজার মানুষ এই যুদ্ধের অবসানের দাবি জানিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের মতে ব্রিটিশ সরকারের উচিত যুদ্ধকে সমর্থন না করে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটা।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উত্তর সাগরে যুক্তরাজ্যের নিজস্ব তেলের খনিগুলো নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা দাবি করছেন যে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব খনি থেকে তেল উত্তোলন বাড়ানো উচিত। তবে অনেক পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞ মনে করছেন এটি বর্তমান সংকট মেটাতে তাৎক্ষণিক কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না।
কিয়ার স্টারমারকে এখন একদিকে যেমন ট্রাম্পের চাপ সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর কঠিন লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের শেষ কোথায় তা কেউ জানে না, তবে এটি নিশ্চিত যে এই সংঘাতের রেশ ব্রিটিশ সমাজ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত রেখে যাবে।
