পাকিস্তানের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এক ভয়াবহ সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। গত আধা শতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে জ্বালানি তেলের দামে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে, যা প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের তেল আমদানির মাসিক ব্যয় ৩০০ মিলিয়ন ডলার থেকে একলাফে ৮০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আমদানির এই বিশাল ব্যয় গত দুই বছরে অর্জিত দেশটির সমস্ত অর্থনৈতিক উন্নতিকে কার্যত ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল যাতায়াত খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি কৃষি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। ডন পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ কামরান বাট ব্যাখ্যা করেছেন যে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তা পুরো অর্থনীতিতে একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে।
পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে চাল, ডাল ও সবজির মতো নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। এতে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার রূপ নেয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্টেট ব্যাংক অফ পাকিস্তান তাদের প্রধান সুদের হার এক শতাংশ বাড়িয়ে ১১.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক নীতি কমিটি জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম, পণ্য পরিবহনের খরচ এবং বিমা প্রিমিয়াম এখন প্রাক-সংঘাত সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন, যা পাকিস্তানের মতো আমদানিনির্ভর একটি দেশের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষি সেচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সবই ডিজেল ও পেট্রোলের ওপর নির্ভরশীল।
পাকিস্তানের অর্থনীতির আরেকটি প্রধান স্তম্ভ হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি শ্রমিক এই আয়ের মূল উৎস। কিন্তু বর্তমানে ওই অঞ্চলে সংঘাতের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে এই আয়ের প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। রেমিট্যান্স কমে গেলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
বছরের পর বছর ধরে মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত একটি অর্থনীতির জন্য এই জোড়া ধাক্কা সহ্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।বিশ্লেষকদের মতে, শেহবাজ শরিফ সরকারের সামনে এখন ভালো কোনো বিকল্প খোলা নেই। সরকার যদি বিশ্ববাজারের তেলের বর্ধিত মূল্য সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়, তবে তীব্র জনরোষের মুখে পড়তে হবে।
অন্যদিকে, জ্বালানিতে ভর্তুকি বজায় রাখতে গেলে জাতীয় বাজেটে বিশাল ঘাটতি দেখা দেবে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের পরিপন্থী। পাকিস্তান বর্তমানে আইএমএফের কঠোর তদারকিতে রয়েছে এবং গত এপ্রিলে ভর্তুকির বিষয়ে আবেদন করেও তারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলে সরকার এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং সিন্ধু প্রদেশের সাবেক উপদেষ্টা কায়সার বাঙালি সরকারের বর্তমান কার্যক্রমকে ‘মিতব্যয়িতার নাটক’ বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, সরকারি গাড়ি বা ঘোড়া বিক্রি করার মতো প্রতীকী পদক্ষেপ দিয়ে এই বিশাল জ্বালানি সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
তার মতে, পাকিস্তান এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে মাত্র এক বিলিয়ন ডলারের ঋণের জন্য পুরো রাষ্ট্রকে আইএমএফের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। এই নির্ভরশীলতা দেশকে সার্বভৌম সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধী দলগুলো এই অর্থনৈতিক দুর্দশাকে পুঁজি করে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জেআইউ-এফ নেতা আসলাম ঘাউরি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, সরকারের ভুল নীতির কারণে জনগণের ওপর এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। করাচি ও লাহোরের রিকশাচালকরা ইতিমধ্যেই তেলের দাম কমানোর দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেছেন।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের এই জ্বালানি সংকট কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি শেহবাজ শরিফ সরকারের টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
