ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে যে বিশাল উল্লম্ফন ঘটেছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড ইঙ্গিত দিয়েছে যে, দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চলতি বছরই সুদের হার বাড়ানো হতে পারে। বৃহস্পতিবার ব্যাংকটির মুদ্রানীতি কমিটির এক বৈঠকে অধিকাংশ সদস্য ঋণের সুদ হার ৩.৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে ভোট দিলেও ভবিষ্যতে এটি বৃদ্ধির পথ খোলা রেখেছেন। বিশেষ করে তেলের দাম যদি প্রতি ব্যারেল ১৩০ ডলারে পৌঁছায় এবং দীর্ঘ সময় সেই অবস্থায় থাকে, তবে ব্যাংকটি ‘জোরালোভাবে’ পদক্ষেপ নেবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। রয়টার্স ও বিবিসির প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ জোরদার করায় সরবরাহ ব্যবস্থায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, যুদ্ধের শুরু থেকে জ্বালানি তেলের দাম যেভাবে বেড়েছে তা একটি ‘বিশাল ধাক্কা’। তিনি বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বেইলির মতে, মুদ্রাস্ফীতি সবার জন্যই খারাপ, তবে এটি দরিদ্রদের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর কারণ তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্য ও জ্বালানির পেছনে ব্যয় হয়।
ব্রিটেনে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার ৩.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। যুদ্ধের স্থায়িত্ব এবং তীব্রতা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিনটি ভিন্ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বা সিনারিও বিবেচনা করছে। প্রথম পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম কমে গেলে মুদ্রাস্ফীতি বছরের শেষ নাগাদ ৩.৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে দ্বিতীয় পরিস্থিতিটিকেই গভর্নর বেইলি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যেখানে জ্বালানির দাম ধীরগতিতে কমবে এবং মুদ্রাস্ফীতি ৩.৭ শতাংশের কাছাকাছি দীর্ঘস্থায়ী হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিটি হলো তৃতীয়টি, যেখানে তেলের দাম ১২০ ডলারের উপরে স্থির থাকবে এবং মুদ্রাস্ফীতি আগামী বছরের শুরুতে ৬.২ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। এই পরিস্থিতি তৈরি হলে সুদের হার ৫.৫ শতাংশে উন্নীত করা হতে পারে।
গভর্নর বেইলি স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের প্রধান কাজ হলো এই অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অর্থনীতির জন্য একটি সঠিক পথ খুঁজে বের করা। তিনি জানান যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় নমনীয়তা রয়েছে এবং তারা সেই সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে। তবে এই সংকটের সমাধান মূলত নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। যদি ইরানের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তবে সুদের হার না বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ বলছে যে, ব্রিটিশ পরিবারগুলোকে সামনের দিনগুলোতে আরও বেশি জীবনযাত্রার ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
আর্থিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের এই কঠোর অবস্থান মূলত বাজারের প্রত্যাশার প্রতিফলন। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ায় পণ্যের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে, যার চূড়ান্ত বোঝা গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড এখন একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে যাতে সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি কমানো যায়, আবার একই সাথে অর্থনীতি যেন মন্দার কবলে না পড়ে। তবে তেলের বাজার যেভাবে অস্থিতিশীল হয়ে আছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে সুদের হার কমার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা।
