ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইয়ারা ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী সভেন তোরে হোলসেথার এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে সার সরবরাহ ও কাঁচামাল পরিবহন বন্ধ হওয়ার ফলে প্রতি সপ্তাহে বিশ্বে প্রায় ১০০০ কোটি (১০ বিলিয়ন) খাবারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থার মূল ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঘটনার মূল কারণ হলো হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত ইউরিয়া, পটাশ ও অ্যামোনিয়ার মতো সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়। হোলসেথারের মতে, যুদ্ধের কারণে বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫ লাখ টন নাইট্রোজেন সার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। যদি কৃষকরা পর্যাপ্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করতে না পারেন, তবে প্রথম মৌসুমেই অনেক ফসলের ফলন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, যুদ্ধের শুরু থেকে সারের দাম ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরিয়ার দাম প্রতি টনে বেড়ে ৭০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই উচ্চমূল্য কেবল চাষাবাদকেই ব্যাহত করছে না, বরং একটি বৈশ্বিক নিলাম বা বিডিং ওয়ারের ঝুঁকি তৈরি করছে। ইয়ারা প্রধানের মতে, ইউরোপের মতো ধনী দেশগুলো বাড়তি দাম দিয়ে খাবার সংগ্রহ করতে পারলেও উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। এর সরাসরি অর্থ হলো, গরিব দেশগুলোর দরিদ্রতম মানুষগুলোকে এখন খাবারের জন্য সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হবে।
লন্ডন ও সিঙ্গাপুরের কৃষি বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকটের পূর্ণ প্রভাব এখনই টের পাওয়া যাবে না। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে রোপণ মৌসুম চলছে, আর এশিয়ায় কেবল শুরু হচ্ছে। এর ভয়াবহতা বোঝা যাবে বছরের শেষ দিকে যখন ফসল কাটার সময় আসবে। সিঙ্গাপুরের খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পল টেং জানিয়েছেন, এশিয়ার অনেক দেশের কাছে এই মৌসুমের জন্য সারের মজুত থাকলেও সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী মাসগুলোতে চালের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
কৃষকরা এখন চতুর্মুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছেন। একদিকে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দামের কারণে ট্রাক্টর বা সেচ পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে সারের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। হোলসেথার সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; যুক্তরাজ্য সহ উন্নত দেশগুলোতেও বছরের শেষ নাগাদ খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপরই এখন নির্ভর করছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের অন্ন সংস্থান। বৈশ্বিক এই সংকট নিরসনে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং সারের সরবরাহ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় সারের ঘাটতি শুধু কৃষি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলবে।
