রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

আফ্রিকা-চীন বাণিজ্য: ৫৩ দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিল বেইজিং

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১, ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম

আফ্রিকা-চীন বাণিজ্য: ৫৩ দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিল বেইজিং

আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা ঘোষণা করেছে চীন। শুক্রবার থেকে মহাদেশটির প্রায় সকল দেশের জন্য শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা কার্যকর করেছে বেইজিং। তবে এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে একমাত্র দেশ এসাওয়াতিনিকে, যা আগে সোয়াজিল্যান্ড নামে পরিচিত ছিল। মূলত তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে দেশটিকে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে চীন। বেইজিংয়ের এই নতুন নীতির ফলে আফ্রিকার ৫৩টি দেশ এখন থেকে চীনে পণ্য রপ্তানিতে কোনো ধরনের শুল্ক ছাড়াই প্রবেশাধিকার পাবে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চীন আফ্রিকার ৩৩টি স্বল্পোন্নত দেশের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছিল। তবে শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন এই নীতি অনুযায়ী মহাদেশের ৫৩টি দেশ এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই বিশেষ সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। চীন দাবি করেছে যে তারাই বিশ্বের প্রথম বড় অর্থনীতি যারা পুরো মহাদেশের জন্য এমন একতরফা শূন্য শুল্ক সুবিধা প্রদান করছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন এটি চীনের সফট পাওয়ার বা প্রভাব বিস্তারের একটি বড় কৌশল।

অস্টচায়না ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো লরেন জনস্টনের মতে চীন নিজেকে একজন বন্ধুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে। তিনি মনে করেন আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতির বিপরীতে বেইজিং বাণিজ্য উদারীকরণের পথে হাঁটছে। উল্লেখ্য যে যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের আগস্টে কিছু আফ্রিকান দেশের পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল, যা পরে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ১০ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়। চীনের এই পদক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই মহাদেশটিতে মার্কিন প্রভাবের বিপরীতে বেইজিংয়ের অবস্থান শক্ত করবে।

চীনের এই নতুন উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হলো দুই অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা। গত বছর আফ্রিকার সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি ৬৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১০২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে আফ্রিকা মূলত অশোধিত তেল এবং খনিজ আকরিকের মতো কাঁচামাল চীনে রপ্তানি করে। অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো এবং দক্ষিণ আফ্রিকা বর্তমানে চীনের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। নতুন এই শুল্কমুক্ত সুবিধা বিশেষ করে কৃষি খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। কেনিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য অ্যাভোকাডো, কফি, চা এবং চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে এই ঘাটতি কমানোর বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস আফ্রিকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক জারভিন নাইডু সতর্ক করেছেন যে কেবল শুল্ক কমিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আফ্রিকার অনেক দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এখনও দুর্বল এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বা অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা বা মরক্কোর মতো উন্নত অর্থনীতিগুলো এই সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারলেও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য তা কঠিন হতে পারে। সিঙ্গাপুরের ইস্ট এশিয়ান ইনস্টিটিউটের পরিচালক আলফ্রেড শিপকে মনে করেন স্বল্পমেয়াদে এর প্রভাব কম হলেও দীর্ঘমেয়াদে আফ্রিকার দেশগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে এটি সহায়ক হবে।

চীনা ভোক্তাদের চাহিদার পরিবর্তনও আফ্রিকান উৎপাদকদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে। বর্তমানে চীনে কফি এবং বাদামের চাহিদা ২০ বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি। কেনিয়া বা ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে পারে। তবে ২০২৮ সালের পর এই নীতির ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো বার্তা দেয়নি বেইজিং। আপাতত এই পদক্ষেপটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে চীনকে একটি নমনীয় ও উদার অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

banner
Link copied!