রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ব্রাজিলে বন নিধন কমলেও জলবায়ু পরিবর্তনের আগুনে পুড়ছে আমাজন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

ব্রাজিলে বন নিধন কমলেও জলবায়ু পরিবর্তনের আগুনে পুড়ছে আমাজন

২০২৪ সালের রেকর্ড ধ্বংসযজ্ঞের পর ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ক্রান্তীয় রেইনফরেস্ট বা চিরহরিৎ বন উজাড় হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই) এবং ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের গবেষকদের প্রকাশিত বুধবারের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৩ লাখ হেক্টর ক্রান্তীয় প্রাথমিক রেইনফরেস্ট বিলীন হয়ে গেছে যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ কম। পরিবেশবাদীরা একে একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন এবং এর পেছনে মূলত বিভিন্ন দেশের সরকারের নেওয়া কঠোর সিদ্ধান্ত ও নীতিকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে ব্রাজিলের আমাজন বন রক্ষায় দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নেওয়া পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

লুলা দা সিলভা ২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর বন নিধন বিরোধী একটি শক্তিশালী কর্মপরিকল্পনা পুনরায় চালু করেন এবং পরিবেশগত অপরাধের জন্য শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে দেন। গবেষকরা বলছেন ব্রাজিলে দাবানল ছাড়া অন্যান্য কারণে বন ধ্বংসের পরিমাণ ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ কমেছে যা দেশটির ইতিহাসে রেকর্ড সাফল্য। 

তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি গবেষকরা একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন যে দাবানল এখন বন রক্ষার ক্ষেত্রে নতুন এবং বিপজ্জনক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বনে লাগা আগুন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্জিত অনেক সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। গবেষকদের মতে ২০২৫ সালের এই বড় আকারের হ্রাস মূলত একটি চরম আগুনের বছর পার হওয়ার পরের স্বাভাবিক স্তিমিত অবস্থা।

ব্রাজিলের প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়াতেও বন রক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। দেশটিতে বন উজাড়ের হার ১৭ শতাংশ কমেছে যা ২০১৬ সালের পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন রেকর্ড। সেখানে সরকারি নীতি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে বন পরিষ্কার সীমিত করার চুক্তিগুলো কার্যকর ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্বের অন্য অংশে চিত্রটি এখনো উদ্বেগজনক রয়ে গেছে। 

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (ডিআরসি) এবং ক্যামেরুনে ক্রান্তীয় বন ধ্বংসের হার এখনো অনেক উঁচুতে অবস্থান করছে। গবেষকরা বলছেন যদিও গত বছর বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক গাছপালা কমে যাওয়ার হার ১৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে তবুও আমরা ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এখনো অনেক দূরে রয়েছি।

২০৩০ সালের মধ্যে বন ধ্বংস পুরোপুরি বন্ধ করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বর্তমানে আমরা তার চেয়ে ৭০ শতাংশ পিছিয়ে আছি। এছাড়া চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে যা পুনরায় তীব্র তাপ্রবাহ এবং খরা সৃষ্টি করতে পারে। এটি বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে যা পরিবেশের জন্য একটি বড় হুমকি। 

গত বছর কানাডায় ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল যেখানে প্রায় ৫৩ লাখ হেক্টর বন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উত্তর গোলার্ধের এই ধ্বংসযজ্ঞও বৈশ্বিক বন হ্রাসের পরিসংখ্যানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

ডব্লিউআরআই-এর গ্লোবাল ফরেস্ট ডিরেক্টর রড টেলর এক বিবৃতিতে বলেছেন যে বনগুলো মূলত কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কাজ করে। কিন্তু উত্তপ্ত পৃথিবীতে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং আগুনের প্রকোপ এই বাস্তুসংস্থানগুলোকে কার্বন শোষকের বদলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের উৎসে পরিণত করছে। 

ব্রাজিলের মতো দেশগুলো সয়াবিন উৎপাদন এবং গবাদি পশুর খামার সম্প্রসারণের চাপে থাকলেও সরকারি কঠোর নজরদারিই পারে এই অমূল্য সম্পদ রক্ষা করতে। গবেষকরা মনে করেন ২০২৫ সালের এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে হলে শুধুমাত্র নীতি প্রণয়ন নয় বরং মাঠ পর্যায়ে তার সঠিক বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক এই নতুন স্বাভাবিকতাকে মোকাবিলা করতে হলে বন রক্ষায় আরও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে হবে।

banner
Link copied!