রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

সুন্দর পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি ও ইসলামের অনন্য দিকনির্দেশনা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম

সুন্দর পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি ও ইসলামের অনন্য দিকনির্দেশনা

একটি সুন্দর সমাজ গঠনের প্রাথমিক ও প্রধান একক হলো পরিবার। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে যদি সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বিদ্যমান থাকে, তবেই একটি প্রশান্তিময় জীবন গঠন সম্ভব হয়। বর্তমান সময়ের ব্যস্ততা ও ডিজিটাল ডিভাইসের অতি ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্যে পারিবারিক দূরত্ব বাড়ছে। 

এই সংকটময় সময়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত সে বিষয়ে সঠিক ধারণা রাখা এবং তা প্রয়োগ করা জরুরি। ইসলামের সুমহান আদর্শে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের অধিকার ও তাদের সাথে আচরণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে যা যেকোনো যুগ ও সময়ের জন্য কার্যকর।

পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো মা-বাবা। তাদের সাথে আচরণের বিষয়ে আল-কুরআনে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তাদের সাথে সামান্যতম বিরক্তিও প্রকাশ না করা হয়। মা-বাবার প্রতি দয়াশীল হওয়া এবং বার্ধক্যে তাদের ছায়ার মতো আগলে রাখা প্রতিটি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা তাদের জন্য দোয়া করি এবং বিনম্রভাবে কথা বলি (সূরা বনি ইসরাঈল, ১৭:২৩-২৪)। 

একজন আদর্শ সংবাদকর্মী বা সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দেখা উচিত বর্তমান সমাজে মা-বাবারা কতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছেন। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং কোনো বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও তা অত্যন্ত নম্রতার সাথে প্রকাশ করা সুসম্পর্কের প্রধান শর্ত।

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আচরণ হতে হবে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা ভিত্তিক। একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করাই হলো একটি সুখী পরিবারের চাবিকাঠি। কঠোরতা বা আধিপত্য বিস্তারের পরিবর্তে পরামর্শ ও ত্যাগের মানসিকতা এখানে বেশি প্রয়োজন। 

মহানবী (সা.) শিখিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার পরিবারের কাছে উত্তম (সহীহ আল-বুখারী, ৪৭১৩)। পরিবারের ছোটখাটো ভুলত্রুটি এড়িয়ে চলা এবং ভালো কাজগুলোতে একে অপরকে উৎসাহিত করার মাধ্যমেই ঘরে জান্নাতি পরিবেশ তৈরি হয়। অতিরিক্ত রাগ বা কটূক্তি সম্পর্কের দেয়াল তৈরি করে, তাই ধৈর্য ও ক্ষমার চর্চা করা প্রতিটি দম্পতির জন্য আবশ্যক।

সন্তানদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে স্নেহ ও মমতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, তাই বড়দের উচিত তাদের সামনে নিজেদের আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা। সন্তানদের কেবল শাসন নয় বরং তাদের সাথে বন্ধুর মতো মিশতে হবে যাতে তারা মনের কথা সহজে শেয়ার করতে পারে। রাসূল (সা.) শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাদের সাথে কোমল আচরণ করতেন। 

সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। তাদের ছোটখাটো সাফল্যকে উদযাপন করা এবং ব্যর্থতায় পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জোগানো একজন আদর্শ অভিভাবকের পরিচয়।

ভাই-বোন ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা ইসলামের একটি অপরিহার্য বিধান। তুচ্ছ কারণে একে অপরের সাথে কথা বন্ধ রাখা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। যারা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে আল্লাহ তাদের রিজিক ও হায়াত বাড়িয়ে দেন (সহীহ আল-বুখারী, ৫৯৮৬)। 

পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে হলে মাঝে মাঝে একে অপরের খোঁজ নেওয়া, উপহার বিনিময় করা এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে পরিবারের বয়স্ক ও অসুস্থ সদস্যদের প্রতি আলাদা মনোযোগ দেওয়া এবং তাদের সেবা করা তরুণ প্রজন্মের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

পরিশেষে বলা যায় যে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সাথে সুন্দর আচরণ কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয় বরং এটি একটি ইবাদত। কথা বলার সময় নম্রতা বজায় রাখা, অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা হস্তক্ষেপ না করা এবং একে অপরের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকাই হলো আদর্শ পারিবারিক আচরণের মূলভিত্তি। 

আমরা যদি ঘর থেকে সুন্দর আচরণের চর্চা শুরু করি তবে তার ইতিবাচক প্রভাব পুরো সমাজে পড়বে। একটি মজবুত পরিবার মানেই একটি শক্তিশালী ও শান্তিময় জাতি। তাই আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করা উচিত যে আমরা পরিবারের ছোট-বড় সবার সাথে সম্মান ও ভালোবাসার সাথে মিশব।

banner
Link copied!