ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় (ডিআর কঙ্গো) ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারির বিশেষ ধরনটির বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা তৈরিতে অন্তত নয় মাস সময় লাগতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বুধবার এই গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছে। বুন্দিবুগিও নামের এই বিশেষ প্রজাতির ভাইরাসের বিরুদ্ধে দুটি সম্ভাব্য টিকা নিয়ে কাজ চললেও এখনো কোনোটিরই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়নি।
ডব্লিউএইচও-এর উপদেষ্টা ড. ভ্যাসি মূর্তির মতে, এই টিকাগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল গবেষণার প্রয়োজন।
জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডব্লিউএইচও প্রধান ড. তেদ্রোস আধানম গেব্রেইয়াসুস জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৬০০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ডিআর কঙ্গোতে ৫১ জন এবং প্রতিবেশী উগান্ডায় দুজনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় শনাক্ত হওয়া দুজনই কঙ্গো থেকে গিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে একজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন।
গত রোববার এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
তবে ডব্লিউএইচও প্রধান স্পষ্ট করেছেন যে, এটি এখনই বৈশ্বিক মহামারি পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সংস্থার জরুরি কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে এই মহামারির ঝুঁকি অনেক বেশি হলেও বিশ্বজুড়ে তা ছড়ানোর আশঙ্কা আপাতত কম। ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে যুক্তরাজ্য সরকার ইতোমধ্যে দুই কোটি পাউন্ড আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশই এখন এই প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্র।
গত ২৪ এপ্রিল ইতুরির রাজধানী বুনিয়াতে এক সেবিকা প্রথম এই ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে মারা যান। এরপর তার মৃতদেহ মঙ্গোয়ালু নামের একটি স্বর্ণখনি শহরে নেওয়া হলে সেখানেই দ্রুত সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স বা এমএসএফ-এর জরুরি কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ট্রিশ নিউপোর্ট এএফপি-কে জানিয়েছেন, স্থানীয় হাসপাতালগুলো রোগীতে একেবারে ভরে গেছে এবং নতুন রোগী রাখার আর কোনো জায়গাই অবশিষ্ট নেই।
স্থানীয় অধিবাসীদের সামাজিক জীবনেও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বুনিয়ার বাসিন্দা আরালি বাগাম্বা বিবিসি-কে জানিয়েছেন, মানুষ ভাইরাসের ভয়ে একে অপরের সাথে হাত মেলানো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। ইবোলা সাধারণত শারীরিক তরল এবং ক্ষতের মাধ্যমে ছড়ায়, যা ভয়াবহ রক্তক্ষরণ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে দেয়। ডিআর কঙ্গো এর আগে ১৬ বার ইবোলা পরিস্থিতি সামাল দিলেও এক দশকের বেশি সময় পর ফিরে আসা বুন্দিবুগিও ধরনটি তাদের জন্য বড় ধরনের চিকিৎসা সংকট তৈরি করেছে।
এই নির্দিষ্ট ধরনের ইবোলার চিকিৎসার জন্য এখনো কোনো অনুমোদিত ওষুধ নেই।
এর আগে ২০০৭ সালে উগান্ডায় এবং ২০১২ সালে কঙ্গোতে বুন্দিবুগিওর প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল, যেখানে আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশই মারা যান। ড. মূর্তি জানিয়েছেন, কোভিড-১৯ এর জন্য ব্যবহৃত অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে দ্বিতীয় একটি সম্ভাব্য ইবোলা টিকা তৈরি করা হচ্ছে। তবে প্রাণীদের ওপর এর কার্যকারিতার কোনো প্রমাণিত তথ্য এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।
ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েডের মতো সাধারণ রোগের সাথে এর প্রাথমিক লক্ষণের মিল থাকায় শুরুতে অনেকেই রোগটি শনাক্ত করতে পারেননি।
যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছিল যে ডব্লিউএইচও এই প্রাদুর্ভাব শনাক্ত করতে কিছুটা দেরি করেছে, তবে তেদ্রোস এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরেন। এর পাশাপাশি কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিনের চলমান সশস্ত্র সংঘাত ভাইরাসের বিস্তার রোধের কাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
