মহামারি বা সংক্রামক রোগের খবর আমাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং মানুষের আচরণগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা বিহেভিয়ারাল ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে তোলে বলে বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলা বা নতুন করে হান্টা ভাইরাসের সংক্রমণের মতো খবরগুলো যখন দৈনন্দিন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অদৃশ্য ভীতি তৈরি হয়। বেশিরভাগ মানুষ হয়তো এসব ভাইরাসের সংস্পর্শে কখনোই আসবে না। তবু এই খবরগুলো আমাদের মনস্তত্ত্বে এমন কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনে, যা সামাজিক আচরণ থেকে শুরু করে অপরিচিতদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যন্ত বদলে দিতে পারে। এই মানসিক প্রতিক্রিয়াগুলো অনেক সময় মানুষকে অতিরিক্ত সতর্ক করে তোলে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের শরীরে যেমন রোগজীবাণু ধ্বংস করার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে, তেমনি মানসিকভাবেও সংক্রমণ এড়ানোর একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা কাজ করে। শারীরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। ম্যাক্রোফেজ বা টি-সেলের মতো উপাদানগুলো যখন জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে, তখন শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই ধকল এড়াতেই বিবর্তনের ধারায় মানুষের মধ্যে মানসিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার গবেষক মার্ক শ্যালার এই প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন আচরণগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সাধারণ রূপ হলো পচা জিনিসের গন্ধ পেলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে ঘৃণার উদ্রেক হয়। মহামারির মতো সংকটের সময় এই মানসিক সুরক্ষাবলয় মানুষকে সামাজিক নিয়মকানুন বেশি মেনে চলতে বাধ্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, রোগের সংক্রমণের কথা মনে করিয়ে দিলে মানুষের মধ্যে ঝুঁকি এড়ানোর এবং অন্যদের অনুসরণ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। হংকং ইউনিভার্সিটির এক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের কিছু আধুনিক শিল্পকর্ম মূল্যায়ন করতে দেওয়া হয়েছিল। যাদের আগে থেকে খোলা ক্ষত বা পচা জিনিসের ভয়াবহ চিত্র দেখিয়ে সংক্রমণের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তারা স্বাধীন মতামতের বদলে অন্য দর্শনার্থীদের মতামতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিল। অন্যদিকে, যারা সাধারণ দুর্ঘটনার ছবি দেখেছিল, তাদের মধ্যে এমন অনুকরণের প্রবণতা দেখা যায়নি। ডেনমার্কের আরহাস ইউনিভার্সিটির গবেষক লিন আরো এবং তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন, সংক্রমণের ভয় অনেক সময় ভিন্ন গোষ্ঠী বা অভিবাসীদের প্রতি আস্থার অভাব তৈরি করে। মানুষ অবচেতনভাবেই অনেক সময় বহিরাগতদের রোগজীবাণু বহনকারী হিসেবে ধরে নেয়।
বাস্তব জীবনেও এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় ইতালির পাদুয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক জুলিয়া ফুওচির করা এক জরিপে দেখা যায়, ভাইরাসের ভয় মানুষের মধ্যে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও বিদেশিদের প্রতি সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছিল। যা কম স্পষ্ট তা হলো, সবাই একইভাবে এই পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া দেখায় কি না। মানুষের শিক্ষা, পেশা, পারিবারিক পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এই মানসিক পরিবর্তনগুলো ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
আচরণগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মানুষের নৈতিক বিচারবোধকেও প্রভাবিত করে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। রোগের সংক্রমণের ভয় কাজ করলে মানুষ অন্যের আচরণগত ত্রুটির প্রতি অনেক বেশি কঠোর হয়ে ওঠে। মূলত সমাজের বৃহত্তর স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থেই আদিমকাল থেকে মানুষের মধ্যে এই ধরনের মানসিকতা তৈরি হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। যখনই সংবাদমাধ্যমে সংক্রামক ব্যাধির খবর আসে, তখন এটি আমাদের অবচেতন মনকে কীভাবে পরিচালিত করছে তা খেয়াল রাখা জরুরি। কারণ এই ভীতি অনেক সময় সমাজে অহেতুক দূরত্বের সৃষ্টি করতে পারে।
