রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন বিপ্লব: অস্ত্রোপচার ছাড়াই মিলছে মুক্তি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ০২:২৭ পিএম

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন বিপ্লব: অস্ত্রোপচার ছাড়াই মিলছে মুক্তি

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন আশা ‍। Ai ছবি

ক্যানসার চিকিৎসায় গত এক শতাব্দী ধরে চলমান গবেষণার পর ইমিউনোথেরাপি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা অনেক রোগীর জীবনকে অবিশ্বাস্যভাবে বদলে দিচ্ছে। নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের চিকিৎসকরা ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন ছাড়াই ক্যানসার নির্মূল করতে সক্ষম হচ্ছেন বলে বিবিসির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এই পদ্ধতিকে প্রায় বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো মনে করছেন কারণ এটি শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ক্যানসার কোষকে চিহ্নিত ও ধ্বংস করে। 

নিউইয়র্কের বাসিন্দা ৭১ বছর বয়সী মরিন সিডেরিস এই সফল চিকিৎসার অন্যতম এক উদাহরণ। ২০০৮ সালে কোলন ক্যানসারের জন্য তাকে জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হলেও এক যুগ পর যখন তার খাদ্যনালীতে ক্যানসার ধরা পড়ে তখন চিকিৎসকরা তাকে ‍‍`ডস্টারলিম্যাব‍‍` নামক একটি ওষুধের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করেন। মাত্র চার মাসের চিকিৎসায় কোনো বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই তার টিউমার পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।

ইমিউনোথেরাপির মূল লক্ষ্য হলো ক্যানসার কোষের ছদ্মবেশ উন্মোচন করা। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম সাধারণত বহিরাগত শত্রু বা অস্বাভাবিক কোষকে ধ্বংস করে কিন্তু ক্যানসার কোষ অনেক সময় সুস্থ কোষের রূপ ধরে ইমিউন সিস্টেমকে ফাঁকি দেয়। টেক্সাসের এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টারের অধ্যাপক জেনিফার ওয়ার্গো জানান যে বর্তমানে চিকিৎসকরা কেবল ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ নয় বরং এটি পুরোপুরি নিরাময় করার কথা বলছেন। 

এই আধুনিক চিকিৎসায় মূলত কার টি-সেল থেরাপি এবং ইমিউন চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর নামক দুটি পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কার টি-সেল থেরাপিতে রোগীর রক্ত থেকে টি-সেল সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে সেগুলোকে শক্তিশালী করা হয় যাতে তারা ক্যানসার কোষ খুঁজে বের করে আক্রমণ করতে পারে। অন্যদিকে চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর ওষুধগুলো ইমিউন সিস্টেমের সেই ‍‍`অফ‍‍` সুইচটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় যা ক্যানসার কোষগুলো ব্যবহার করে আত্মরক্ষা করত।

তবে এই চিকিৎসার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে যা নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক গবেষণা চলছে। লন্ডনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অনকোলজিস্ট সামরা তুরাজলিকের মতে ইমিউনোথেরাপি বর্তমানে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে কাজ করছে। চেকপয়েন্ট ইনহিবিটরগুলো অনেক সময় শরীরের সুস্থ টিস্যুতেও আক্রমণ করতে পারে যার ফলে ক্লান্তি বা ডায়রিয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাসের সাথে ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতার সম্পর্ক নিয়েও কাজ করছেন। 

এমডি অ্যান্ডারসনের গবেষণায় দেখা গেছে যে উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে এমন পরিবর্তন আসে যা থেরাপির ফলাফলকে আরও উন্নত করতে পারে। এমনকি চিকিৎসার সময় বা টাইমিংও ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের গবেষকরা ২০২২ এবং ২০২৪ সালে রেকটাল ক্যানসারের ওপর দুটি ছোট ট্রায়াল পরিচালনা করেন যেখানে একটি নির্দিষ্ট জেনেটিক প্রোফাইল থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা শতভাগ সফল হয়েছে। 

চিকিৎসক লুইস ডিয়াজ জানান যে বর্তমানে ১১৭ জন রোগীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে ১০৩ জনের মধ্যে ৮৪ জনই অস্ত্রোপচার ছাড়াই ক্যানসার মুক্ত হয়েছেন। যদিও মাত্র ৫ শতাংশ টিউমারে এমন জেনেটিক বৈশিষ্ট্য থাকে তবুও এটি আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসার ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ডানা-ফারবার ক্যানসার ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ক্যানসার ভ্যাকসিনের প্রাথমিক সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন যেখানে ৯ জন রোগীকে ক্যানসার মুক্ত রাখতে টিকা সফলভাবে কাজ করেছে। 

চিকিৎসকদের মতে আগামী এক দশকের মধ্যে কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন হয়তো অনেক পুরনো ও অপ্রচলিত পদ্ধতিতে পরিণত হবে এবং ব্যক্তিগতকৃত ইমিউনোথেরাপিই হবে ক্যানসার জয়ের প্রধান হাতিয়ার।

banner
Link copied!