মানুষের শরীরের ওজন কমাতে ব্যবহৃত বিশেষ কিছু ওষুধ মদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমিয়ে দিচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন এই আবিষ্কারের ফলে স্থূলতা কমানোর পাশাপাশি অ্যালকোহলের আসক্তি চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। ওজন কমানোর এই ওষুধগুলো সেমাগ্লুটাইড কিংবা টিরজেপাটাইডের মতো উপাদানে সমৃদ্ধ, যা মস্তিষ্কের পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। এর ফলে শুধু অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতাই কমে না, বরং বিভিন্ন ক্ষতিকর পানীয় গ্রহণের ইচ্ছাও হ্রাস পায়।
যুক্তরাজ্যের সাউথ ওয়েলসের অধিবাসী লিসা রিস নামের এক নারী সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তিনি যখন ওজন কমানোর ওষুধ নেওয়া শুরু করেন, তখন তিনি কেবল কিছু ওজন কমানোর আশা করেছিলেন। কিন্তু তার জীবনে এর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে দেখা দিয়েছে মদের প্রতি অনীহা। অতীতে সামাজিক আয়োজনে তিনি নিয়মিত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মদ পান করলেও ওষুধ সেবনের পর থেকে সেই অভ্যাস নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এখন সামান্য পরিমাণ পান করার পরেই তাঁর শরীরে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়, যার ফলে তিনি আর অতিরিক্ত পান করতে পারেন না।
বিজ্ঞানীরা বলছেন যে এই ওষুধগুলো মানবদেহের ভেতরের প্রাকৃতিক হরমোনের অনুকরণ করে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি বজায় রাখে। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মস্তিষ্কের স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে এই ওষুধগুলো তামাক ও মদের মতো নেশাদ্রব্যের প্রতি তীব্র আকর্ষণ কমিয়ে দিতে সক্ষম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গত বছর অ্যালকোহল ব্যবহারজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের ওপর একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন। সেখানে দেখা গেছে যে নির্দিষ্ট এই ওষুধ গ্রহণের ফলে রোগীদের মধ্যে মদ্যপানের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন যে সাধারণ মানুষ বা যাদের ওজন অতিরিক্ত নয়, তাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের আসক্তি চিকিৎসার জন্য ওষুধ ব্যবহারের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে এই ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বমি ভাব, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা কিংবা বিরল ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাছাড়া এই ওষুধগুলোর মূল্য ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সাধারণ মানুষের জন্য কতটা উপযোগী হবে, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে সবার অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ জানিয়েছেন যে এই ওষুধের কারণে মদ্যপানের পর দ্রুত বমি ভাব বা এসিড রিফ্লাক্সের মতো সমস্যা দেখা দেওয়ায় তাঁদের সামাজিক জীবন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় অংশ নেওয়া বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবে মেলামেশা করার ক্ষেত্রে তাঁরা নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হন। তবুও সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করছেন যে স্থূলতা ও আসক্তি দূর করার ক্ষেত্রে এই ওষুধগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিপ্লব ঘটাতে পারে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হওয়ার পর চিকিৎসকরা এই পদ্ধতিকে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহারের অনুমোদন দিতে পারবেন।
অতিরিক্ত মদ্যপান মানবদেহের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, যকৃটের স্থায়ী ক্ষতি এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক ব্যাধির সঙ্গে অতিরিক্ত মদ্যপানের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে পরিমিত জীবনযাপন এবং আসক্তি পরিহার করার পরামর্শ দিয়ে আসছে। বর্তমান সময়ে ওজন হ্রাসের এই ওষুধগুলো মানুষের জীবনধারায় এক অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন এনে দিয়েছে, যা গবেষকদের নতুন নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। আগামী দিনে চিকিৎসাবিজ্ঞান এই আবিষ্কারকে কীভাবে আরও উন্নত করে এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
