ক্যাফেইন মানবদেহে কীভাবে কাজ করে এবং কেন একেকজনের ক্ষেত্রে এর প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছেন চিকিৎসা গবেষকেরা। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সাময়িকী ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, একই পরিমাণ কফি পানের পর কেউ রাতের গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে পারেন, আবার কারও ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখের পাতা এক করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। শরীরে এই উপাদানের স্থায়িত্বকাল এবং শারীরিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ভিন্নতাই এই পার্থক্যের মূল কারণ।
বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন দুইশ কোটিরও বেশি কাপ কফি পান করা হয়।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাফেইন আসলে শরীরে বাড়তি কোনো শক্তি যোগায় না, বরং শারীরিক ক্লান্তিকে সাময়িকভাবে আড়াল করে রাখে। সারাদিনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে মানুষের মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ জমা হতে থাকে, যা একপর্যায়ে শরীরে ঘুমের চাপ তৈরি করে। ক্যাফেইন মস্তিষ্কের সেই কার্যপদ্ধতি সাময়িকভাবে আটকে দেয়, ফলে মানুষ সাময়িক সতেজতা অনুভব করে। তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহারে মাথাব্যথা, হাত কাঁপুনি, হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিক গতি এবং গভীর অনিদ্রা দেখা দিতে পারে।
যকৃতের এনজাইম কীভাবে ক্যাফেইনকে ভেঙে শরীর থেকে বের করে দেয়, তার ওপর শারীরিক প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর মেরিলিন কর্নলিস জানান, রক্তে মেশার পর ক্যাফেইন পুরোপুরি শরীর থেকে দূর হতে ব্যক্তিভেদে ছয় থেকে বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের একটি নির্দিষ্ট জিন যকৃতে এই প্রক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার মানুষেরা অন্যদের তুলনায় দ্রুত এই উপাদান নিষ্কাশন করতে পারে। এছাড়া ধূমপান যকৃতের এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়, যার কারণে ধূমপায়ীরা সাধারণত বেশি কফি পান করেন।
উল্টোদিকে কিছু নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক ও গর্ভনিরোধক ওষুধ শরীরে ক্যাফেইন ভাঙার গতি মন্থর করে এর কার্যকাল দীর্ঘায়িত করে।
গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের ফলেও ক্যাফেইন রক্তে দীর্ঘসময় অবস্থান করে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা কর্তৃপক্ষ গর্ভবতী নারীদের দিনে ক্যাফেইন গ্রহণ সর্বোচ্চ ২০০ মিলিগ্রাম বা প্রায় দুই মগ ফিল্টার কফির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ অতিরিক্ত গ্রহণ শিশুর জন্মকালীন ওজন কম হওয়ার ঝুঁকির সাথে যুক্ত। দীর্ঘদিনের কফি পানের অভ্যাসের কারণে মানুষের শরীর ক্যাফেইনে সহনশীল হয়ে ওঠে, ফলে প্রাথমিক উদ্দীপনা অনেকটাই হ্রাস পায়।
ঘুম বিশেষজ্ঞরা রাতের বিশ্রামের অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে যেকোনো ধরনের ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলার তাগিদ দিয়েছেন। ঘুম বিশেষজ্ঞ ডক্টর লিন্ডসে ব্রাউনিং জানান, ক্যাফেইন কেবল চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নেয় না, বরং ঘুমের গভীর মানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই রাত ১০টায় ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে দুপুর ২টার পর কফি বা কোলা জাতীয় পানীয় পরিহার করাই উত্তম।
যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক পিটার রজার্স নিশ্চিত করেছেন যে পরিমিত ক্যাফেইন গ্রহণ মানবদেহের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। অতিরিক্ত তীব্র বিষক্রিয়া মূলত সরাসরি ঘনীভূত পাউডার বা জটিল সম্পূরকের মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণের ফলে ঘটে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে কফি পানের অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বেশ কিছু জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতে এবং মানুষের সুস্থ আয়ু বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
