কাবাব তৈরির প্রাচীন কৌশল কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডেকোটা অঙ্গরাজ্যের প্রধান খাদ্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ওয়্যার সার্ভিস ও খাদ্য গবেষকদের তথ্যমতে, মধ্য এশিয়ার তাতারদের তলোয়ারের ডগায় সেদ্ধ মাংস আজ মার্কিন সমভূমির রেস্তোরাঁগুলোতে ডুবো তেলে ভাজা চিসলিক হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে। ক্রিমিয়া থেকে অভিবাসী হয়ে আসা জনগোষ্ঠীর হাত ধরে শুরু হওয়া এই রূপান্তর অবশেষে সেখানকার সরকারি স্বীকৃতিও অর্জন করেছে।
তলোয়ারের ডগা থেকে টুথপিকে এই খাবারের পথচলা ইতিহাসকে ধারণ করে।
সাউথ ডেকোটার ফ্রিম্যান অঞ্চলের একটি প্রাচীন খাবার দোকানে অর্ডার দেওয়ার এক মিনিটের মধ্যেই পরিবেশন করা হয় ভেড়া ও খাসির মাংসের তৈরি চিসলিক। ছোট ছোট কাঠের কাঠিতে গাঁথা মাংসের টুকরো ডুবো তেলে ভেজে ক্র্যাকার বিস্কুট ও রসুনের লবণের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। স্থানীয় ঐতিহাসিক মারনেট হোফার জানান, গোটা সাউথ ডেকোটাতেও এই খাবারের অস্তিত্ব একসময় সীমাবদ্ধ ছিল একটি নির্দিষ্ট এলাকায়। অথচ ২০১৮ সালে রাজ্যটির আইনসভা এটিকে সাউথ ডেকোটার অফিশিয়াল হালকা খাবার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
সপ্তদশ শতকে কৃষ্ণসাগর ও ককেশাস অঞ্চলে রাশিয়ার সেনাদের অভিযানের সময় তাতারদের তৈরি এই শিকের মাংসের সূচনা হয়।
তাতাররা খাসির মাংস ছোট টুকরো করে পেঁয়াজ কিংবা ভিনেগারে ভিজিয়ে ধাতব শলাকা বা তলোয়ারের ডগায় গেঁথে কাঠকয়লায় ঝলসাত। এই খাবারটিকে রুশ ভাষায় শাসলিক বলা হতো। পরবর্তীতে রাশিয়ায় বসতি গড়া জার্মান সম্প্রদায় শাসলিক গ্রহণ করে এবং নিজেদের ঐতিহ্যে পরিণত করে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার তাদের ধর্মীয় অধিকার ও সামরিক ছাড় বাতিল করলে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের জমি দান আইনের আওতায় যে ১ লাখ ১৫ হাজার অভিবাসী মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে এসেছিলেন, তাদের সঙ্গেই ছিল রান্নার এই গোপন বিদ্যা।
হোয়েলওয়ার্থ নামের এক রুশ-জার্মান অভিবাসী ১৮৭০-এর দশকে সাউথ ডেকোটার ফ্রিম্যানে প্রথম এই খাবারের প্রচলন ঘটান।
তার মুখের ভারী রুশ বাচনভঙ্গির কারণে স্থানীয় মার্কিন বাসিন্দারা শাসলিক শব্দটিকে চিসলিক হিসেবে শুনতে শুরু করে। নতুন দেশে এসে হোয়েলওয়ার্থ দেখেন যে সেখানে ক্রিমিয়ার মতো বনাঞ্চল বা কাঠকয়লা নেই। পেঁয়াজ ও ভিনেগারের তীব্র সংকট থাকায় তিনি স্থানীয় লম্বা বুনো ঘাসের দ্রুত ওঠা আগুনে কড়াই বসিয়ে চর্বি দিয়ে মাংস ভাজার নতুন পদ্ধতি বের করেন। লোহার শিকের বিকল্প হিসেবে তিনি উইলো গাছের ডাল কেটে তৈরি করেন কাঠের কাঠি। চার জুলাইয়ের মার্কিন স্বাধীনতা উৎসবে পরিবেশিত হওয়ার পর থেকে এটি আমেরিকান সমভূমিতে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ফ্রিম্যানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রায় ত্রিশ মাইল সীমানাকে গবেষকরা আজ চিসলিক সার্কেল হিসেবে চিহ্নিত করেন।
দীর্ঘ ৬৫ বছর ধরে কেলর লকার নামের কসাইখানা এই এলাকার মাংসের চাহিদা পূরণ করে আসছে। আধুনিক সময়ে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ এই পদ্ধতিতে নিজস্ব পরিবর্তন এনেছে। কোনো কোনো পাব শিকের বদলে সরাসরি কড়াইতে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে মাংস ভাজে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান পনির কিংবা জালাপেনো মরিচ যুক্ত করে স্বাদ বাড়ায়। এমনকি ফ্রিম্যানের ঐতিহ্যবাহী উৎসবে গরুর মাংসের পাশাপাশি নানা ধরনের মাংস ব্যবহারের পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে।
তবে সাউথ ডেকোটার মানুষের কাছে চিসলিক কেবল একটি মুখরোচক খাবার নয়, বরং পরিশ্রমী ও অমায়িক জীবনের এক চিরন্তন স্মারক।
