দক্ষিণ চীন সাগরের কৌশলগত ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করে চীন তার প্রথম আধুনিক নদী থেকে সমুদ্রমুখী নৌপথ উন্মোচন করেছে। গুয়াংজি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে নির্মিত পিংলু খাল চালুর মাধ্যমে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান অংশীদারদের মধ্যকার সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের দূরত্ব কমিয়ে আনা হয়েছে।
উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এশিয়ার বাণিজ্য মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।
ভিয়েতনামের সীমান্তবর্তী এবং দক্ষিণ চীন সাগরের মুখোমুখি গুয়াংজির দক্ষিণাংশে সম্পূর্ণভাবে অবস্থিত এই কৃত্রিম জলপথটির দৈর্ঘ্য ১৩৪ কিলোমিটার বা ৮৩ মাইল। সিজিয়াং নদীকে বেয়ুবু উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী এই খালটি গালফ অফ টনকিনের উত্তর-পশ্চিম বাহুর সঙ্গে সরাসরি মেলবন্ধন তৈরি করেছে। এর ফলে ইউনান ও গুইঝৌয়ের মতো দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের বিশাল অন্তদেশীয় প্রদেশগুলোর জন্য সমুদ্র ও বৃহত্তর এশীয় বাজারে প্রবেশের পথ সুগম হয়েছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ফ্ল্যাগশিপ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের নিউ ইন্টারন্যাশনাল ল্যান্ড-সি ট্রেড করিডরের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করতে মহাসড়ক, বন্দর এবং রেলপথের সমন্বয়ে এই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
গুয়াংজি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, এই খালের সুবাদে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর মধ্যকার শিপিং দূরত্ব প্রায় ৫৬০ কিলোমিটার বা ৩৫০ মাইল কমে আসবে। একই সঙ্গে সামগ্রিক লজিস্টিকস বা পরিবহন খরচ ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিবহন খরচের সাশ্রয় বাণিজ্যে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে।
গুয়াংজি সরকারের উপ-মহাসচিব ঝাং ঝিওয়েনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই খালের কারণে কেবল পরিবহন বাবদ বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি বা প্রায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে। অঞ্চলের উপ-প্রধানমন্ত্রীর মতে, এই অর্থনৈতিক সুফলগুলো পরিচালন ব্যয় কমিয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করবে।
প্রায় ৭২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউয়ান বা ১ হাজার ৮০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই জলপথটি ৫ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ভারী জাহাজ চলাচলের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে উপকূল থেকে দূরে অবস্থিত দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের প্রধান শিল্পাঞ্চল ও শহরগুলো সরাসরি সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছে। এই করিডর কেবল গুয়াংজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি চংকিং, সিচুয়ান প্রদেশের চেংদু, গুইঝৌ এবং ইউনানের মতো প্রধান অর্থনৈতিক হাবগুলোকে বেয়ুবু উপসাগরের বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।
চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। চীনের সাধারণ শুল্ক প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই এই দুই পক্ষের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৬৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
বন্দরের সক্ষমতাও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেয়ুবু উপসাগর বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বা পণ্য খালাস ক্ষমতা ২০১৭ সালের ২ দশমিক ২৮ মিলিয়ন টিইইউ থেকে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে ১০ দশমিক ০৬ মিলিয়ন টিইইউতে উন্নীত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান বন্দরগুলোর সঙ্গে এর সরাসরি শিপিং নেটওয়ার্ক বিস্তৃত রয়েছে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি গুয়াংজি কর্তৃপক্ষ এই জলপথকে কেন্দ্র করে পিংলু খাল অর্থনৈতিক বেল্ট গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলকে এই নতুন করিডরের সঙ্গে যুক্ত করা, যার মধ্যে অ লৌহঘটিত ধাতু, উন্নত সবুজ রাসায়নিক শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতগুলো অর্ন্তভুক্ত রয়েছে। বন্দরগুলোর কাছাকাছি নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ফলে উৎপাদন কেন্দ্র ও শিপিং সেন্টারের মধ্যকার দূরত্ব আরও কমে এসেছে।
পরিচালনার সুবিধার্থে গুয়াংজি প্রশাসন একটি ধাপভিত্তিক ফি ব্যবস্থা চালু করেছে।
আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাণিজ্যিক নৌযানগুলো এই খালের তিনটি জলগেট সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অতিক্রম করতে পারবে। পরবর্তীতে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে শুরু করে প্রতিটি জাহাজের ধারণক্ষমতার প্রতি টনের জন্য এক ইউয়ান বা প্রায় শূন্য দশমিক ১৪ মার্কিন ডলার হারে শুল্ক ধার্য করা হবে, যা সেপ্টেম্বর ২০৩১ পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে বলবৎ থাকবে। এর ফলে নদীযানগুলো কোনো ধরনের বাড়তি কার্গো স্থানান্তর ছাড়াই সরাসরি কিনঝৌ সমুদ্রবন্দরের বার্থে পৌঁছাতে পারবে।
তবে এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে এক সংবেদনশীল মানবিক দিকও রয়েছে।
প্রকল্পের কারণে চারটি কাউন্টি ও কাউন্টি-পর্যায়ের শহরের মোট ২ হাজার ৭৬৪ পরিবারের ১১ হাজার ২২৮ জন মানুষকে তাদের চিরচেনা ভূমি থেকে পুনর্বাসিত করতে হয়েছে। কেবল হেংঝৌ শহরেই ৩৬৮টি বাড়ির জন্য উচ্ছেদ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ৮৪ হাজার ২০০ বর্গমিটার এলাকার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়। এর ফলে ১ হাজার ২২১ জন বাসিন্দাকে অস্থায়ীভাবে অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে হয়।
পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণই দেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২১টি ভিন্ন আবাসন মডেল ডিজাইন করা হয়েছিল, যেখানে অভ্যর্থনাকক্ষ, ফসল শুকানোর উঠান, পশুপালনের ঘর এবং কৃষি রাসায়নিক সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থার কথা মাথায় রাখা হয়। বৃহত্তম পুনর্বাসন শহর শেপিংয়ে বাসিন্দাদের চারতলা বিশিষ্ট ৪২০ বর্গমিটারের বাড়ি দেওয়া হয়েছে, যার কিছু অংশে রাস্তার দিকের বাণিজ্যিক দোকানও রয়েছে। মাত্র ৩৯ দিনের মধ্যে এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, যেখানে নির্মাণ সাইটে চাকরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্ব অর্থনীতিতে জলপথ এবং সামুদ্রিক করিডর বরাবরই ক্ষমতার প্রধান ধমনী হিসেবে কাজ করেছে।
হরমুজ প্রণালীর বর্তমান সংকটের দিকে তাকালে এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সামান্য হুমকিতেই পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্য স্থবির হয়ে যেতে পারে। এই পটভূমিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কেবল একটি বা দুটি প্রধান রুটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পাইপলাইন, গুদাম এবং পরিবহন করিডর গড়ে তুলতে সচেষ্ট রয়েছে।
এই বৈশ্বিক কৌশলেরই অংশ হিসেবে চীন পিংলু খাল নির্মাণ করেছে।
অপ্রতিরোধ্য এই মেগা প্রকল্পের মধ্য দিয়ে বেইজিং তার কৌশলগত বাণিজ্য রুটগুলোকে আরও সুরক্ষিত এবং গতিশীল করার আরেকটি বড় পদক্ষেপ সম্পন্ন করল, যা আগামী দিনে এশিয়ার সাপ্লাই চেইনের পুরো গতিপ্রকৃতি পাল্টে দিতে পারে।
