মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩

ইয়েমেনে সংঘাত: জিবুতিতে পালাচ্ছেন হাজারো মানুষ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

ইয়েমেনে সংঘাত: জিবুতিতে পালাচ্ছেন হাজারো মানুষ

ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হওয়ার পর লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় তিন হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ প্রতিবেশী জিবুতির উত্তর উপকূলে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরু থেকে হুথি বিদ্রোহীরা উপকূলীয় অঞ্চলে অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর থেকেই এই সংকট মারাত্মক রূপ নিয়েছে। হর্ন অব আফ্রিকার ছোট দেশ জিবুতির মোট জনসংখ্যা ১২ লাখের কম হওয়ায় সেখানে এই অপ্রত্যাশিত মানবিক চাপ সামাল দিতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে।

যুদ্ধ থেকে বাঁচতে সমুদ্রই এখন শেষ ভরসা।

জিবুতির উত্তরাঞ্চলীয় বন্দর শহর ওবকের উপকূলে কাঠের তৈরি ছোট ঢাউ ও বড় ট্রলারে করে দিনরাত নারী, পুরুষ ও শিশুরা এসে নামছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার জিবুতি প্রধান আলেকজান্ডার কয়স্যাক জানিয়েছেন, একটি নৌযানেই শত শত মানুষকে গাদাগাদি করে সমুদ্র পাড়ি দিতে দেখা গেছে। যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে জ্বালানি সংকটের কারণে বহু পরিবার এখনও ইয়েমেনের উপকূলে আটকা পড়ে রয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, সমুদ্র পাড়ি দেওয়া শিশুরা প্রচণ্ড দাবদাহ, পানিশূন্যতা এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকটে ভুগছে।

অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে তছনছ হয়ে গেছে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চল। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দুই সপ্তাহেই দেশটিতে অন্তত ৮৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং মাকবানাহ ও জাবাল হাবাশির মতো জনপদগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেছে। জিবুতির অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস দাওয়ালেহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে জানান, আশ্রয়প্রার্থীদের ঢল এত দ্রুত গতিতে বাড়ছে যে স্থানীয় প্রশাসনের একার পক্ষে তা সামলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওবকের উপকূলে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীকে ত্রাণ তৎপরতায় নামানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবদুল কাদের কামিল মোহাম্মদ সরেজমিনে ওবক পরিদর্শন করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন।

আফ্রিকার এই ছোট্ট উপকূলে জমা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সংকট।

উপকূলবর্তী ওবক শহরের কাছে অবস্থিত মারকাজি শরণার্থী শিবিরটি আবারও চালু করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দারাও এগিয়ে এসে শরণার্থীদের খাদ্য ও আশ্রয় দিচ্ছেন। তবে বৈশ্বিক সাহায্য সংস্থাগুলো নিজেরাই তহবিলের বড় ধরনের ঘাটতিতে রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দাতা দেশগুলো অনুদান কমিয়ে দেওয়ায় জাতিসংঘের খাদ্য ও স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোর ওপর বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মানবিক বিপর্যয়ের প্রভাব কেবল আশ্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় এক-অষ্টমাংশ পণ্য পরিবহন করা হয়। সেখানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে জিবুতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, জাপান ও ইতালির সামরিক ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রকট হচ্ছে।

এডেন উপসাগরের অপর পাড়ে সোমালিয়ার স্বশাসিত অঞ্চল পুন্টল্যান্ড ও সোমালিল্যান্ডও সম্ভাব্য শরণার্থী প্রবাহ মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করেছে। বোসাসো ও বারবেরা বন্দরের দিকে এই চাপ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। জিবুতিতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা দ্রুতই দশ হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ, যার ফলে আফ্রিকার এই উপকূলে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর রূপ নিতে পারে।

banner
Link copied!