সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ভুল ক্যান্সারের চিকিৎসায় ১১ বছর কেমোথেরাপির শিকার নারী

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম

ভুল ক্যান্সারের চিকিৎসায় ১১ বছর কেমোথেরাপির শিকার নারী

ক্যান্সার না থাকা সত্ত্বেও ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে এক নারীকে টানা ১১ বছর ধরে তীব্র কেমোথেরাপির ওষুধ নিতে বাধ্য করার একটি গুরুতর ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে যুক্তরাজ্যে। কভেন্ট্রির বাসিন্দা বেকি জোন্স যখন মাত্র ২১ বছর বয়সী তরুণী ছিলেন, তখন তাকে বলা হয়েছিল তিনি মস্তিষ্কের দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং তার হাতে মাত্র কয়েক মাসের আয়ু রয়েছে। অথচ দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর জানা গেছে, তিনি মূলত মস্তিষ্কের একটি সাধারণ প্রদাহে ভুগছিলেন যা সাধারণ স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধেই পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য ছিল।

এই দীর্ঘ ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে তার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে।

চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্র অনুযায়ী, কভেন্ট্রির একটি হাসপাতালের পরামর্শক অধ্যাপক ইয়ান ব্রাউন তাকে টেমোজোলোমাইড নামের একটি মুখে খাওয়ার কেমোথেরাপির ওষুধ আজীবন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সাধারণ চিকিৎসা নির্দেশিকায় এই ধরনের ওষুধ ছয় মাসে ছয়টি সাইকেলে শেষ করার সুপারিশ থাকলেও তাকে বছরের পর বছর এই রাসায়নিক প্রয়োগের মধ্যে রাখা হয়। বিভিন্ন সময়ে মস্তিষ্কের স্ক্যানে কোনো ধরনের টিউমারের অস্তিত্ব না মিললেও চিকিৎসকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে এটি সাধারণ দৃষ্টিতে বোঝা সম্ভব নয়। অবশেষে ২০২৫ সালের মে মাসে অন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে করা স্বাধীন পর্যালোচনায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি টিউমিফ্যাক্টিভ ডিমায়েলিনেশন নামের স্নায়বিক প্রদাহে আক্রান্ত ছিলেন, কোনো ক্যান্সারে নয়।

এই ভুল সিদ্ধান্তের পেছনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতালের মারাত্মক পেশাগত ঘাটতি উঠে এসেছে।

দীর্ঘ ১১ বছর ধরে কেমোথেরাপির শক্তিশালী ওষুধ সেবনের ফলে ওই নারীকে প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড বমিভাব, পেটের তীব্র যন্ত্রণা, মুখের ভেতরে ঘা এবং মারাত্মক শারীরিক ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। সামাজিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পাশাপাশি সংক্রমণ ঝুঁকির কারণে তিনি স্বাভাবিক চলাফেরার অধিকারও হারিয়েছিলেন। তাকে জানানো হয়েছিল তিনি কখনোই সন্তান জন্ম দিতে পারবেন না, যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি দুই সন্তানের মা হয়েছেন। চিকিৎসকের পক্ষ থেকে তখন একে অলৌকিক ঘটনা বলে বর্ণনা করা হয়েছিল।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার এনএইচএস ট্রাস্টের বিরুদ্ধে ৪০ জনেরও বেশি রোগী ইতিমধ্যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। অন্যান্য রোগীদের ক্ষেত্রেও বছরের পর বছর এই ওষুধ দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে, যার ফলে এক রোগীর দেহে লিউকেমিয়া বা রক্তের ক্যান্সার তৈরি হয় এবং অপর এক নারী বন্ধ্যত্বের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ২০টি কেসের মধ্যে ১৫টির ক্ষেত্রেই সেবা অত্যন্ত অসন্তোষজনক ছিল। পর্যালোচকেরা একে রোগীর আস্থার চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছেন, একটি হাসপাতালের ফার্মেসি দল কীভাবে টানা এক দশক ধরে কোনো প্রশ্ন না তুলেই এমন তীব্র কেমোথেরাপির ওষুধ সরবরাহ করে গেল।

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, প্রাথমিক বায়োপসি পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল আসার আগেই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক তাকে গ্রেড ফোর গ্লিওব্লাস্টোমা নামের মারাত্মক ক্যান্সারে আক্রান্ত বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

অভিযুক্ত চিকিৎসক বর্তমানে অবসরে থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সব রোগীকে ইতিমধ্যে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে এনে বিকল্প পরিচর্যা পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে এবং কর্মীদের অভিযোগ তোলার স্বাধীন প্রক্রিয়াটি পুনরায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

banner
Link copied!