প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে একটি অতি শক্তিশালী `সুপার এল নিনো` রূপ ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্যে জানিয়েছে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তিন দশমিক ছয় ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জুন মাস থেকে তৈরি হতে থাকা এই উষ্ণ জলবায়ু চক্রটি আগামী ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাবে এবং মে মাস পর্যন্ত এর ক্ষতিকর প্রভাব বজায় থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক আবহাওয়াবিদরা।
বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড় ধরনের ওলটপালট শুরু হতে যাচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেওয়া এই প্রাকৃতিক পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে চরম বিপরীতমুখী আবহাওয়ার জন্ম দেয়। এর প্রভাবে পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও মারাত্মক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কেনিয়াভিত্তিক সংস্থা আইগাড সতর্ক করেছে যে চলতি বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দক্ষিণ ইথিওপিয়া, সোমালিয়া এবং কেনিয়ার একাংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা শতকরা ৯০ ভাগ। অপরদিকে দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর, পেরু, উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আগামী কয়েক মাস ধরে অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ আঘাত হানতে পারে।
বৃষ্টির এই প্রাচুর্যের ঠিক উল্টো চিত্র দেখা দিচ্ছে এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার দক্ষিণাংশে ইতিমধ্যে তীব্র অনাবৃষ্টি ও খরার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে দেশটিতে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় তীব্র শুষ্কতার কারণে জুলাই মাসের মধ্যেই পাঁচ হাজারটির বেশি স্থানে বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় উষ্ণ আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তার সামনে দাঁড়িয়েছে আরেক বড় সংকট।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, এই খরা ও অসময়ের বন্যা সবচেয়ে বড় আঘাত হানবে কৃষিখাতে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে যে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ চরম অনাহার ও তীব্র খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে অতিরিক্ত চার কোটি ৯০ লাখ মানুষ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে এশিয়া ও আফ্রিকার প্রধান খাদ্যশস্য ধান ও ভুট্টা উৎপাদন খরার কবলে পড়ে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিশ্চয়তার জন্য এটি এক বিরাট মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
বিজ্ঞানীরা আরও নিশ্চিত করেছেন যে এই সুপার এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত একটি বছর ২০২৪ সালের উষ্ণতম রেকর্ডের চেয়েও বেশি তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৮৬ ভাগ। বায়ুমণ্ডলের উচ্চগতির বাতাস বা জেট স্ট্রিম দক্ষিণের দিকে সরে যাওয়ার ফলে উত্তর আমেরিকায় শীতকালীন স্বাভাবিক তুষারপাত নাটকীয়ভাবে বাধাগ্রস্ত হলেও আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেনের প্রকোপ কিছুটা স্তিমিত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে মার্কিন আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্র।
