অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে অচেতন করার আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা মানবদেহের ব্যথা দূর করার ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক সাফল্য হলেও চেতনানাশক ওষুধের ক্রিয়ায় মানব মস্তিষ্কের গভীর চেতনা কীভাবে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়, তা আজও বিজ্ঞানের অন্যতম অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন কোনো কার্যকর অ্যানেস্থেশিয়া আবিষ্কৃত হয়নি, তখন প্রায় সজাগ অবস্থাতেই অঙ্গচ্ছেদের মতো কঠিন অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে হতো। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৮৪৬ সালে সাধারণ চেতনানাশকের আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের পর থেকে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়।
প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৩৫ কোটির বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হচ্ছে সাধারণ চেতনানাশক ব্যবহারের মাধ্যমে।
চিকিৎসকদের ব্যবহৃত চেতনানাশক ওষুধগুলোর মধ্যে নানা বৈচিত্র্য রয়েছে। কোনোটি সরাসরি ব্যথা অনুভূতি থামিয়ে দেয়, আবার কোনোটি রোগীকে শান্ত ও তন্দ্রাচ্ছন্ন করে তোলে। তবে সাধারণ চেতনানাশক পুরো প্রক্রিয়াটিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে মানুষকে এমন এক নিস্তব্ধ অচেতন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে বাহ্যিক জগতের কোনো অনুভূতি অবশিষ্ট থাকে না। খুব কম ব্যবহৃত নিষ্ক্রিয় গ্যাস জেনন থেকে শুরু করে বর্তমানে সর্বাধিক ব্যবহৃত তরল প্রোপোফল পর্যন্ত এই ওষুধগুলোর রাসায়নিক গঠনে বিশাল পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। মস্তিষ্কের চৌম্বকীয় অনুরণন প্রতিচ্ছবি বা এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে যে এই ওষুধগুলো স্নায়ুকোষের মধ্যকার পারস্পরিক বার্তাপ্রেরণ বন্ধ করে সামগ্রিক কার্যক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়।
বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে এই প্রক্রিয়ায় পুরো মস্তিষ্ক একসাথে স্তব্ধ হয়, নাকি নির্দিষ্ট কোনো স্পর্শকাতর অংশ আগে নিস্তেজ হয়ে বাকি অংশে প্রভাব বিস্তার করে।
যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বায়োফিজিক্স ও অ্যানেস্থেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক নিক ফ্র্যাঙ্কস জানান, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ পারস্পরিকভাবে এত জটিল জাল দিয়ে যুক্ত যে ঠিক কোন অংশটি প্রথম বন্ধ হচ্ছে তা নির্ণয় করা অত্যন্ত দুরূহ। তবে আধুনিক মস্তিষ্কের স্ক্যানে দেখা গেছে যে থ্যালামাস নামের ডিম্বাকৃতির কেন্দ্রীয় সংযোগস্থলটি সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং এটিই সবার আগে কার্যকারিতা হারায়। থ্যালামাস মূলত মানবদেহের প্রাকৃতিক ঘুম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। ফ্র্যাঙ্কসের মতে, চেতনানাশক ওষুধগুলো মস্তিষ্কের এই প্রাকৃতিক ঘুম চক্রকেই নিয়ন্ত্রণ করে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাণীদের অচেতন করার পর থ্যালামাসের নির্দিষ্ট অংশে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিয়ে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে জাগিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। এমনকি গভীর কোমায় থাকা কিছু মানুষকেও একই প্রক্রিয়ায় সচেতন করা গেছে।
বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, মস্তিষ্কের বাইরের কুঁচকানো আবরণ বা সেরেব্রাল কর্টেক্সেই মানুষের চেতনার মূল আবাস। তাই চেতনানাশকের প্রধান ক্রিয়া সেখানেই সংঘটিত হয় বলে তারা মত প্রকাশ করেন। পাশাপাশি কপালসংলগ্ন সামনের অংশ ফ্রন্টাল লোব, যা মানুষের জটিল বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করে, এবং পেছনের প্যারাইটাল লোব, যা স্পর্শের মতো ইন্দ্রিয় সংবেদন প্রক্রিয়াজাত করে, সেগুলোও সমানভাবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
গবেষণায় চেতনার এক অজানা মধ্যবর্তী স্তরের সন্ধান মিলেছে।
অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের সময় অজ্ঞান হওয়া মানে স্মৃতি ও অনুভূতির সম্পূর্ণ বিলোপ ঘটা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১৫ হাজার রোগীর মধ্যে অন্তত একজন অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফিরে পাওয়ার সময় কিছু অংশের স্মৃতি মনে করতে পারেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে আকস্মিক সচেতনতা নামে পরিচিত। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি হসপিটালসের অ্যানেস্থেটিস্ট পরামর্শক জয়দীপ পণ্ডিতের মতে, এটি প্রমাণ করে যে মানুষের মস্তিষ্কে ঘুম এবং জাগরণের মাঝখানে সম্পূর্ণ আলাদা একটি তৃতীয় চেতনার স্তর থাকতে পারে।
পরীক্ষাগারে রোগীদের শরীরে চেতনানাশকের সাথে পেশি শিথিলকারী প্রয়োগ করার সময় এক বিশেষ বেল্ট দিয়ে হাতের রক্ত চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে পেশি সচল রাখা হয়। এর ফলে অচেতন রোগীরা চাইলে হাত নাড়ানোর সুযোগ পান। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পুরো অস্ত্রোপচার চলাকালে কোনো ধরনের ব্যথা বা জেগে ওঠার বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন রোগী গবেষকের নির্দেশ অনুসারে তাদের আঙুল চেপে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এই ফল চেতনার ভিন্ন স্তরের অস্তিত্বকেই জোরালোভাবে সমর্থন করে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী আন্দ্রেয়া লুপির নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় বিষয়টি আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে। কার্যক্ষম মস্তিষ্কের স্ক্যানের মাধ্যমে রক্তের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের স্নায়বিক সক্রিয়তা আঙুলের ছাপের মতোই সম্পূর্ণ অনন্য ও ব্যক্তিনির্ভর থাকে। কিন্তু গভীর চেতনানাশকের প্রভাবে বিভিন্ন মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়ে একে অপরের মতো অভিন্ন হয়ে ওঠে। এমনকি মানুষের মস্তিষ্ক তখন আদিম প্রাইমেট প্রাণীদের স্নায়বিক স্তরের কাছাকাছি আচরণ করতে শুরু করে, যা ইঙ্গিত দেয় যে বিবর্তনের ধারায় মানুষের সর্বশেষ বিকশিত অংশগুলোই চেতনানাশকের আঘাতে আগে স্থবির হয়।
লুপি ব্যাখ্যা করেছেন যে স্বাভাবিক সচেতন অবস্থায় মস্তিষ্কের দূরবর্তী অংশগুলো সরাসরি কোনো শারীরিক তার বা সংযোগ ছাড়াই একে অপরের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে। কিন্তু ওষুধের প্রভাবে সেই মুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং কেবল সরাসরি যুক্ত থাকা অংশগুলো সীমিত পরিসরে সক্রিয় থাকে। এই পরিস্থিতিকে একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল করে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট করার সাথে তুলনা করা হয়েছে। চেতনা কোনো একক মস্তিষ্কের কেন্দ্র থেকে জন্ম নেয় না, বরং তা বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সমন্বিত ঐকতান মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক বরিস হাইফেটস স্পষ্ট করেছেন যে মানুষের চেতনা কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা এখনো অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
