তানজানিয়া, বলিভিয়া এবং নামিবিয়ার ঐতিহ্যবাহী শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিদ্রাহীনতা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের গবেষণায় নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এসব সমাজে ঘুমের সমস্যা বা অনিদ্রার কোনো অস্তিত্বই নেই। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় লস অ্যাঞ্জেলেসের অধ্যাপক জেরোম সিগেল পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে, শিল্পোন্নত দেশের তুলনায় এসব সমাজের মানুষ কম সময় ঘুমালেও তাদের শারীরিক কর্মক্ষমতা ও ঘুমের মান অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ।
তাদের অভিধানে অনিদ্রা বলে কোনো শব্দ নেই।
বিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক সমাজের নিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম পরিবেশ মানুষের আদিম জৈবিক ঘড়িকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করছে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ অ্যান্ড হিউম্যান ইভোলিউশন ল্যাবের পরিচালক ডেভিড স্যামসন জানান, দিনের বেলা প্রাকৃতিক সূর্যের আলোতে থাকার অভ্যাস শরীরের এই জৈবঘড়ি ঠিক রাখতে মূল ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলোতে থাকা ব্যক্তিরা রাতে ডিজিটাল পর্দার ক্ষতিকর প্রভাব সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারেন। একই সঙ্গে ঘরের ভেতরের স্থির কৃত্রিম তাপমাত্রার বদলে রাতের বেলা তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে রাখার অভ্যাস ঘুম দ্রুত আনতে ভূমিকা রাখে।
সূর্যাস্তের পরপরই শিকারি সমাজের মানুষ ঘুমিয়ে পড়েন না।
দিনের কাজ শেষে তারা রাতের বেলায় আগুন জ্বালিয়ে গল্প করা এবং সামাজিক যোগাযোগের মতো কাজে সময় কাটান। নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী অ্যালিসা ক্রিটেনডেন দীর্ঘদিন তানজানিয়ার হাদজা সম্প্রদায়ের সঙ্গে থেকে দেখেছেন, রাতের সামাজিক মেলামেশা মস্তিষ্ককে দিনের কাজের চাপ থেকে মুক্ত করে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে। এটিকে বিজ্ঞানীরা রাত্রিকালীন পারস্পরিক সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেছেন। মানুষের পাশে থাকার এই সামাজিক অনুভূতি বিচ্ছিন্নতা কমিয়ে স্বাভাবিক বিশ্রাম নিশ্চিত করে।
প্রতি রাতে টানা আট ঘণ্টার নিশ্ছিদ্র নিখুঁত ঘুমের লক্ষ্যকে গবেষকরা মনস্তাত্ত্বিক ভ্রান্তি হিসেবে দেখছেন। নৃবিজ্ঞানী গান্ধী ইয়েতিশ ব্যাখ্যা করেন, মানুষ কোনো যন্ত্র নয় যে প্রতিদিনের ঘুমের রূপরেখা ঠিক একই মাপের হতে হবে। আবহাওয়া ও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই ঘুমের সময়ের ওঠানামা ঘটে থাকে। নিখুঁতভাবে ঘুমানোর মানসিক চাপ উল্টো মানুষের শরীরে স্থায়ী অনিদ্রার জন্ম দিচ্ছে বলে মত দিয়েছেন গবেষকরা।
